২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের চিত্র পাল্টে যায়। নতুন সরকারের অধীনে ক্রীড়াঙ্গনে শুরুতে সবচেয়ে বড় নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে)। ২৬ অক্টোবর সেই নির্বাচনে অনেকটা সহজেই সভাপতির পদে জায়গা করে নেন তাবিথ আউয়াল। কাজী সালাউদ্দিনের দীর্ঘ শাসনামলের পর প্রথম বছরে তিনি কী করেছেন, সেটাই এখন আলোচনার। এই সময়ে বাফুফের সভাপতি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ফুটবলে নতুন করে জোয়ার আনার চেষ্টা করেছেন। হামজা চৌধুরী-ঋতুপর্ণা চাকমাদের ঘিরে কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সমর্থকরাও নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে। এবার আলোচনা করা যাক বিস্তারিত-
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা
কাজী সালাউদ্দিনের সময়ে শেষ দিকে এসে আন্তর্জাতিক ম্যাচ কিংবা বিদেশি কোচ সবকিছু ঠিক থাকলেও ফুটবল সেভাবে জেগে উঠছিল না। কোথায় যেন খামতি থেকেই গিয়েছিল। বরং আর্থিক অনিয়মের কারণে ফিফা থেকে সাসপেনশনের পর অমানিশা অন্ধকার নেমে আসে। দেশের পট পরিবর্তনের পর তো সালাউদ্দিন আর নির্বাচনই করতে পারেননি। আগের দুই মেয়াদে সহ-সভাপতি থাকা তাবিথ প্রথমবার সভাপতি হয়ে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দিকে জোর দেন।
৭ মার্চ তো বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ওপর থেকে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ২০১৮ সাল থেকে ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে ফিফার যে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ছিল, সেটিও তুলে নিয়েছে বৈশ্বিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এখন অন্তত বাফুফের অভ্যন্তরে অন্তত আর্থিক অনিয়মের কথা সেভাবে শোনা যায় কমই। যদিও নানাভাবে আয়-ব্যয় মেটানো হচ্ছে। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68fd0dcbeb725" ) ); হামজা-শমিতদের নিয়ে নতুন জোয়ার
জাতীয় দলকেন্দ্রিক কাজ বেশি করে আপাতদৃষ্টিতে ফুটবলের প্রতি মানুষজনের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন। বিশেষ করে ইংলিশ লিগে খেলা হামজা চৌধুরীর লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেকের পর মনে হচ্ছিল ফুটবলই দেশের প্রধান খেলা! শুধু কী তাই? হামজার সঙ্গে কানাডা প্রবাসী শমিত সোম, ইতালি থেকে ফাহামিদুল ইসলাম ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে জায়ান আহমেদ এসে তো হাইপ আরও বাড়িয়ে দেন।
এশিয়ান কাপের বাছাইয়ে ভারত, সিঙ্গাপুর ও হংকং ম্যাচ দিয়ে এর প্রভাব পরিষ্কার করে ফুটেও উঠে। ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে যেন কতদিন পর ফুটবলের পরশে গণজোয়ারের দেখা মেলে। সেই আগের জমজমাট স্মৃতি যেন ফিরে আসে। টিকিটের জন্য হাহাকার, দেশ যেন ফুটবল উন্মাদনায় দুলছিল। এর আগে এক ফাহামিদুলকে দলে নেওয়া নিয়ে সমর্থকরা তো টিম হোটেলের সামনে গিয়েও আন্দোলন করেছেন।
পাশাপাশি বাংলাদেশের স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরাকে নিয়ে বিতর্কও হচ্ছে। এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে এবার ভালো সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু হংকংয়ের কাছে হেরে সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। কাবরেরার দল পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তো আছেই। কেন কাবরেরাকে এখনও কোচ করে রাখা হয়েছে তাও অজানা অনেকের কাছে। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68fd0dcbeb755" ) ); এশিয়ান কাপে ঋতুপর্ণারা
ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের উন্মাদনা আরও বেশি। টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে। মিয়ানমারে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে নাম লেখায় তারা। এরপর ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপা জিতে যেন দেশের ফুটবল উড়ছে! ছেলে ও মেয়েদের পারফরম্যান্সের কারণে দেশের ফুটবলে স্পন্সরররাও আসতে শুরু করে দিয়েছে।
তবে এখানে আরেকটি বিষয় হলো সাফ জেতার পর দেড় কোটি টাকার বোনাস এখনও দেওয়া হয়নি দলকে। বরং মিয়ানমার থেকে সাফল্য নিয়ে আসা দলকে মধ্যরাতে হাতিরঝিলে শুধু ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে কর্ম সারা হয়েছে! তবে অদূর ভবিষ্যতে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস মিলেছে। মাঝে মেয়েদের কোচ পিটার বাটলারকে কেন্দ্র্র করে বিদ্রোহ নিয়ে বড় সংকট তৈরি হয়। আশার কথা সময় লাগলেও তার আপাত সমাধান হয়েছে। এরপর তো সাবিনাদের ছাড়াই মিয়ানমারে সাফল্য এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার এশিয়ান কাপের জন্য মেয়েদের থাইল্যান্ডে প্রীতি ম্যাচ খেলা হচ্ছে। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা আরও বেড়েছে তাতে। বাফুফেও সেখানে বেশি করে জোর দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য এলেও মেয়েদের লিগ নিয়ে কোনও সুখবর মিলছে না। যদিও আশ্বাস মিলেছে, এবছরই নাকি হবে!
ঘরোয়া ফুটবল আগের মতোই!
তবে ফুটবল যথেষ্ট হাইপ উঠলেও পাইপলাইনে এখনও কাজ সেভাবে হয়নি। ঘরোয়া ফুটবলে পেশাদার লিগ সবশেষ হয়েছে জোড়াতালি দিয়ে। আকর্ষণ সবচেয়ে কম ছিল বলতে হবে। এবারও যে খুব ভালো কিছু হবে তা বলা কঠিন। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক আগের চেয়ে কমছেই। ক্লাবগুলোর ভালো দল গঠনে অনীহা,অর্থ সংকট বড় কারণ। ভেন্যুগুলোও মানসম্মত নয়। এছাড়া ঢাকার ফুটবলের পাইপলাইন পাইওনিয়ার থেকে প্রথম বিভাগ বা অন্য লিগগুলো এখনও শুরু করা যায়নি। হবে হবে করে এখনও আলোর মুখ দেখা হয়নি।
মাঠ সমস্যাও প্রকট। সেটার আপাতদৃষ্টিতে বড় কোনও সমাধান চোখে পড়ছে না। এ নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসহ অন্য জায়গায় চেষ্টা করছে বাফুফে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম গাজীপুর সহ কয়েকটি স্টেডিয়াম বাফুফের অনুকূলে দেওয়া হলেও তা এখনও সেভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
জেলা লিগে সাড়া নেই!
জেলার ফুটবলে কিছুটা সাড়া জাগিয়েছে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিক খেলা চলছে। তাতে করে জেলাগুলো কিছুটা চনমনে। তবে জেলা লিগ নিয়ে হতাশা আছে। এখনও পুরোদমে সব জেলাতে লিগ হচ্ছে না। এছাড়া অনূর্ধ-১৫ লিগ হচ্ছে।
এএফসি থেকে বাফুফের ব্রোঞ্জ পদক
তৃণমূলে খুদে ফুটবলারদের নিয়ে কাজ করার জন্য এএফসি থেকে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে বাফুফে। যশোরের শামসুল হুদা স্টেডিয়ামে কয়েকশ ফুটবলারদের নিয়ে উৎসব হয়েছিল। এছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্যক্তি উদ্যোগে একাডেমি নিয়ে কিছু কাজ করায় এএফসি সাধুবাদ জানিয়ে অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে।
তবে ফিফা থেকে এখনও আগের মতো নিজস্ব অ্যাকাডেমি নির্মাণের কোনও সুসংবাদ নেই। ফিফার অর্থায়নে কক্সবাজারে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এক্সিলেন্স সেন্টার নির্মাণ হওয়ার কথা রয়েছে। ডিসেম্বরে পরিষ্কারর হবে সবকিছু।
যদিও বাফুফে সভাপতি ২০২৭ সালে ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের মতো দেশে একাডেমি গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তাবিথ আউয়াল কী বলছেন
এই এক বছরে বাফুফের বড় অর্জন কী- তা জানতে চাওয়া হয়েছিল বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের কাছে। বাংলা ট্রিবিউনকে সাবেক ফুটবলার বলেছেন,‘বড় অর্জন হলো আমরা সারাদেশে ফুটবলকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি। এখন ৬৪টি জেলাতে ফুটবল হচ্ছে।’
ব্যর্থতাও চিহ্নিত করেছেন তাবিথ,‘ব্যর্থতা বলবো ঘরোয়া ফুটবলে এখনও সমর্থকদের সেভাবে দেখা মিলছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ ফুটবল লিগে। ডিজিটাল মিডিয়ায় ও সমর্থকদের এখনও সাড়া কম।’