তালেবান মন্ত্রীর ভারত সফর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

তালেবান মন্ত্রীর ভারত সফর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পা রেখেছেন আফগান তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। আট দিনের এই সফরকে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে এক ‘অবিশ্বাস্য ঘটনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মাত্র চার বছর আগেও যা অকল্পনীয় ছিল, আজ তা দক্ষিণ এশিয়ার নতুন বাস্তবতা। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর ভারতে এটি তাদের প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর। দিল্লি ও কাবুল দুই পক্ষই নিজেদের স্বার্থে পুরোনো শত্রুতা ভুলে সহযোগিতার পথে হাঁটছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

মুত্তাকি শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে নয়াদিল্লি ঘোষণা দিয়েছে, তারা চার বছর পর পুনরায় কাবুলে পূর্ণাঙ্গ ভারতীয় দূতাবাস খুলছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছিল।

এই সফরের মাধ্যমে ভারত তার আফগাননীতি নতুন উচ্চতায় তুলছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। আলোচনায় বাণিজ্য, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা—তিন ক্ষেত্রেই নতুন ধাপের সূচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মুত্তাকির ভারত সফরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা ক্রমশ খারাপের দিকে গেছে। এখন তালেবান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি ‘স্বাধীন ও বহুমাত্রিক’ করতে চাইছে।

জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করায় মুত্তাকি রাশিয়া থেকে দিল্লি পৌঁছান। রাশিয়াই এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন, আমাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আফগানিস্তানের জাতীয় উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে। ভারত আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ।

অন্যদিকে মুত্তাকি বলেন, ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই সফরের মাধ্যমে আমরা নতুন যুগের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করতে চাই।

তিনি জানান, তার সফরের অংশ হিসেবে ভারতীয় ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করবেন।

২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখল করার পর ভারত আতঙ্কে নিজেদের দূতাবাস ও চারটি কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয়। আফগানদের জন্য সব ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই নয়াদিল্লি ‘টেকনিক্যাল টিম’ পাঠিয়ে মানবিক সহায়তা তদারকির কাজ শুরু করে।

এরপর ধীরে ধীরে তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায় ভারত। ২০২২ ও ২০২৩ সালে দুদেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদেশে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। গত বছর তালেবানকে দিল্লিতে নিজস্ব প্রতিনিধি নিয়োগের সুযোগ দেয় ভারত। এমনকি মুম্বাই ও হায়দরাবাদে তাদের কনস্যুলেট খোলার অনুমতিও দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তান ছিল ভারত-পাকিস্তানের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। পাকিস্তানপন্থি তালেবানকে ভারত সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পাকিস্তান তালেবান সরকারকে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানি তালেবান (টিটিপি) হামলা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে তালেবান বলছে, পাকিস্তানের কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে চায়। এই অবস্থায় নয়াদিল্লি তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন মাত্রা আনতে চাইছে।

ভারতের কাছে আফগানিস্তান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামিক স্টেট (আইএস), আল-কায়েদা বা ভারতকেন্দ্রিক জঙ্গিগোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নয়াদিল্লি বরাবরই উদ্বিগ্ন। তালেবান ভারতকে আশ্বস্ত করেছে যে, আফগান মাটি ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হবে না।

একই সঙ্গে ভারত মধ্য এশিয়া ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আফগানিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে দেখছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও চীনের প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করতে পারে দিল্লি।

ভারতের পর্যবেক্ষণমূলক সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর দুই গবেষক হর্ষ ভি পন্ত ও শিবম শেখাওয়াত মনে করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির সুযোগে তালেবান এখন নিজের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় দিতে চায় এবং ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।

ভারতের কৌশল বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানেই বলেন, মুত্তাকির সফর পাকিস্তানের জন্য ধাক্কা। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাস্তববাদী কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় সূচিত করছে। এটি ভারত-তালেবান সম্পর্কের কৌশলগত পুনর্গঠনের ইঙ্গিত।

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin