অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় নজিরবিহীন কঠোর পদক্ষেপ নিতে চলেছে যুক্তরাজ্য। যে তিনটি আফ্রিকান দেশ তাদের অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে থাকা নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে অসহযোগিতা করছে, তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থায় এক বিশাল পরিবর্তন আসতে চলেছে।
বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদক নিশ্চিত হয়েছেন, সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণা দেবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রাথমিক ধাপে যে তিনটি দেশকে টার্গেট করা হয়েছে, সেগুলো হলো- অ্যাঙ্গোলা, নামিবিয়া এবং ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআরসি)।
হোম অফিসের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে এই তিনটি দেশের হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসী এবং বিদেশি অপরাধী থাকা সত্ত্বেও তারা নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ‘অগ্রহণযোগ্যভাবে কম সহযোগিতা’ করছে এবং ‘বাধা সৃষ্টি করছে’, এ কারণে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে তার ‘নৈতিক অভিযান’ পূর্ণ করতে বদ্ধপরিকর। তিনি মনে করেন, এই অভিবাসন দেশের কাঠামোকে 'ছিঁড়ে ফেলছে'। এই প্রস্তাবটি তার বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি প্রধান অংশ। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সেই একই কৌশল গ্রহণ করল, যা এর আগে যুক্তরাষ্ট্রও অসহযোগী দেশগুলোর ওপর নির্বাসন নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে ব্যবহার করেছে।
এই ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায়, যদি তিনটি দেশ অবিলম্বে তাদের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা উন্নত না করে, তবে ব্রিটেন দ্রুত তাদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করবে— যার মধ্যে সম্পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞাও থাকতে পারে। এই শক্তিশালী চাপের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য এমন নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে দেশগুলোকে বাধ্য করতে চাইছে, যাদের ব্রিটেনে থাকার কোনও আইনগত অধিকার নেই।
যুক্তরাজ্য সরকার শাস্তি আরোপের ক্ষেত্রে ধাপভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে। এর শুরুটা নরম কূটনৈতিক পদক্ষেপ দিয়ে হলেও, পরে তা সরকারি কর্মকর্তা, পর্যটক এবং ব্যাবসায়িক পরিদর্শকদের জন্য ভিসা স্থগিতাদেশের মতো কঠোর শাস্তিতে পৌঁছাতে পারে।
প্রত্যর্পণের এই আগ্রাসী উদ্যোগ যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর অভিবাসন নীতির একটি অংশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিকল্পনার মধ্যে আরও রয়েছে—যে-সব অভিবাসী তাদের অপসারণের বিরুদ্ধে আইনি পথে আপিল করে, তাদের আইনি সুযোগ সীমিত করা এবং মানবাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করা। ছোট নৌকায় অবৈধভাবে প্রবেশকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই পরিবর্তনগুলো অপরিহার্য।
গত বছর যুক্তরাজ্য থেকে ৩৫,০০০-এরও বেশি আইনি অধিকারহীন ব্যক্তি অপসারণ করা হয়েছে এবং নতুন ব্যবস্থাগুলো এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করতে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া, যুক্তরাজ্য সাম্প্রতিককালে এক দশকে প্রথমবারের মতো অভিবাসন বিধিতে সবচেয়ে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। নতুন ‘গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড’ পূর্বের প্রত্যাখ্যানের কারণগুলোকে প্রতিস্থাপন করেছে। সরকার আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, আড়াই বছর পর পর শরণার্থী মর্যাদা পর্যালোচনা করা হবে। অর্থাৎ যাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, তাদেরও ফেরত যেতে হতে পারে যদি পরিস্থিতি নিরাপদ মনে হয়।
অবিলম্বে ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকির সম্মুখীন হওয়া তিনটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আপাতত সম্ভাবনা নেই। ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। হোম অফিস এই সম্পর্ককে প্রকাশ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
চুক্তির লক্ষ্য— নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সাক্ষাৎকার বাতিল করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সহজ করা, যাতে ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থী, বিদেশি অপরাধী এবং ভিসার মেয়াদ অতিক্রম করা ব্যক্তিদের অপসারণ দ্রুত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে যে কোনও দেশ অসহযোগিতা করলে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করতে প্রস্তুত, তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বর্তমানে সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার ওপর নিবদ্ধ।