ট্রাইব্যুনালে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার গড়ালো শেখ হাসিনার

ট্রাইব্যুনালে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার গড়ালো শেখ হাসিনার

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

সোমবার (১৭ নভেম্বর) চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করবেন।

বেশ কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলার কার্যক্রম শেষ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলাটির বিচারের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।

এরপর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছর ১৪ আগস্ট তদন্ত সংস্থায় প্রথম অভিযোগ দায়ের হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাতে হাইকোর্টের বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি শফিউল ও সাবেক বিচারপতি মহিতুলকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর নিযুক্ত করে প্রসিকিউশন টিম গঠন করে সরকার।

২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১০ সদস্যের তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন করে সরকার। এতে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে নিয়োগ পান পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত দুই কর্মকর্তা। তারা হলেন অতিরিক্ত ডিআইজি (অবসরপ্রাপ্ত) মো. মাজহারুল হক ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মুহম্মদ শহিদুল্যাহ চৌধুরী।

এরপর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর। সেদিনই এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চলতি বছরের ১২ মে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রসিকিউশন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে গত ১ জুন। প্রসিকিউশনের দাখিল করা অভিযোগপত্রটি ছিল ১৩৫ পৃষ্ঠার। এর সঙ্গে আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার বিভিন্ন নথি ও তথ্য-প্রমাণ জমা দেওয়া হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জানে আলম খান ও মো. আলমগীর।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান দমনে এক হাজার ৪০০ জনকে হত্যা ও ২৫ হাজার মানুষের অঙ্গহানিতে উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দান, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’সহ মোট পাঁচটি অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

গত ২৪ জুন শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে আমির হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে গত ১০ জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় স্বীকার করেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। ওই দিন তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে আমাদের বিরুদ্ধে হত্যা-গণহত্যা সংঘটনের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য। এ ঘটনায় আমি নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করছি। আমি রাজসাক্ষী হয়ে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন চলাকালে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার বিস্তারিত আদালতে তুলে ধরতে চাই। রহস্য উন্মোচনে আদালতকে সহায়তা করতে চাই।’

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ অভিযোগ গঠনের সময় মামুন এসব কথা বলেন। একই দিন এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পাশাপাশি মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলার বিচার শুরু হয়।

এ মামলায় পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। সেগুলো হলো– গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেওয়া; হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ দেওয়া; রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা; রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয় জনকে পোড়ানোর অভিযোগ।

বিচার শুরুর পর থেকে এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের পিতাসহ স্বজনহারা পরিবারের অনেকে। এ ছাড়া সাক্ষ্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নাহিদ ইসলাম এবং আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। ৮৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

এ মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষ ১২ অক্টোবর থেকে শুরু করে মোট ৫ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন মোট ৪ দিন।

সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ওপর বিগত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় প্রসিকিউশন ও আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী তাদের যুক্তিতর্ক ও সমাপনী বক্তব্য শেষ করেন। সেদিন ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান প্রসিকিউশন পক্ষে মামলার সমাপনী বক্তব্য রাখেন। এ সময় আসামিদের স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন ট্রাইব্যুনালের কাছে তার বক্তব্য তুলে ধরেন।

পরে বৈষম‍্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিন জনের বিরুদ্ধে ১৩ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করার দিন নির্ধারণ রেখেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পরে বিগত ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার রায়ের জন্য ১৭ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করে দেন।

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin