যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করে বিতর্ক আরও উসকে দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) শিকাগোর বাইরে এক সেনাঘাঁটিতে শত শত ন্যাশনাল গার্ড জড়ো হন। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই শহরে আরও সেনা পাঠানো এবং ইনসারেকশন অ্যাক্ট (অভ্যুত্থান দমন আইন) প্রয়োগের হুমকি দেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, বহু পুরোনো আইনের বলে আদালতের বাধা উপেক্ষা করে সেনা পাঠানো যাবে। যদিও স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্তের কড়া বিরোধিতা করছে।
ফেডারেল আইনে বেসামরিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সেনাবাহিনী মোতায়েন নিষিদ্ধ হলেও, ‘ইনসারেকশন অ্যাক্ট’ এই নিয়মে ব্যতিক্রম ঘটায়। এর মাধ্যমে সেনারা সরাসরি আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতারে অংশ নিতে পারে। ন্যাশনাল গার্ড সাধারণত গভর্নরের অধীনে থাকে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোতায়েন হয়। তবে ট্রাম্পের আদেশে তাদের ভূমিকা মূলত ফেডারেল সম্পদ রক্ষা ও সাময়িক আটক কার্যক্রমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এক ফেডারেল বিচারক ইতোমধ্যে ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে ন্যাশনাল গার্ড পাঠানো সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন, তবে আরেক বিচারক শিকাগোতে সেনা মোতায়েন অব্যাহত রাখার অনুমতি দিয়েছেন। সেখানে ফেডারেল কর্মকর্তারা অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছেন।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, এই আইন আগেও ব্যবহার হয়েছে। শিকাগোতে অপরাধের হার খুব বেশি, আর যদি গভর্নর ব্যর্থ হন, তাহলে আমরাই দায়িত্ব নেব।
এই আইন প্রেসিডেন্টকে জরুরি পরিস্থিতিতে সেনা মোতায়েনের ক্ষমতা দেয়, তবে এটি সাধারণত গভর্নরদের অনুরোধেই ব্যবহৃত হয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯২ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ.ডব্লিউ. বুশ লস অ্যাঞ্জেলেস দাঙ্গা দমনে এই আইন প্রয়োগ করেছিলেন।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা প্রয়োগের আরেক দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সম্প্রতি সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এক ভাষণে তিনি মার্কিন শহরগুলোকে ‘সামরিক প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেন, যা ডেমোক্র্যাট ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প লস অ্যাঞ্জেলেস, ওয়াশিংটন ডিসি, পোর্টল্যান্ড ও শিকাগোতে গার্ড পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও ডেমোক্র্যাট গভর্নর ও মেয়ররা বলছেন, ট্রাম্পের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
মঙ্গলবার শিকাগো থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের এলউড শহরে সেনাদের একত্রিত হতে দেখা গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, ট্রাম্পের দাবি করা ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ অবস্থা বাস্তবে নেই।
শিকাগোতে সহিংস অপরাধের হার সাম্প্রতিক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক, রেস্তোরাঁ ও থিয়েটারগুলো ব্যস্ত, মানুষ উপকূলে ভিড় করছে।
তবে শহরতলির ব্রডভিউর এক অভিবাসন কেন্দ্রে ফেডারেল বাহিনীর সঙ্গে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীর সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহৃত হয়েছে, কয়েকজন আহত ও অন্তত এক সাংবাদিকসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ইলিনয় গভর্নর জে বি প্রিটজকার বলেন, ট্রাম্প আমাদের সেনাদের রাজনৈতিক গুটি হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং অবৈধভাবে শহরগুলোকে সামরিকীকরণের চেষ্টা করছেন।
ইলিনয় ও শিকাগো প্রশাসন ইতোমধ্যে ট্রাম্প সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যাতে ইলিনয়ের ৩০০ ও টেক্সাসের ৪০০ সেনা ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন বন্ধ করা যায়। ফেডারেল বিচারক এপ্রিল পেরি আপাতত মোতায়েন চালু রাখার অনুমতি দিলেও বুধবারের মধ্যে সরকারের বক্তব্য চেয়েছেন।
এদিকে ওরেগনের এক বিচারক পোর্টল্যান্ডে সেনা পাঠানো স্থগিত রেখেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প যদি সত্যিই ‘ইনসারেকশন অ্যাক্ট’ কার্যকর করেন, তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যদিও সর্বোচ্চ আদালত একাধিকবার বলেছে, আইনটি প্রয়োগের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা একমাত্র প্রেসিডেন্টই নির্ধারণ করতে পারেন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স