তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও যে কারণে খুশি রাজনীতিকরা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও যে কারণে খুশি রাজনীতিকরা

দেড় দশক পর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারা আরও এগিয়ে যাবে। নির্ধারণ হবে রাজনীতির নতুন গতিপথ। কারণ বিগত দিনে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় প্রশাসন শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। আর ভিন্নমতাবলম্বীদের কোনঠাসা করে রেখেছে। যে কারণে পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন ২০১৪, ১৮ ও ২৪ সালে অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে অভিযোগ এসব দলের নেতাদের। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নতুন মাইলফলক হিসেবে মূল্যায়ন করছেন তারা।

তবে এ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে রাখার পক্ষপাতি নন কয়েকজন রাজনীতিক। তাদের মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণেই আমাদের দেশে এ ব্যবস্থার দরকার হচ্ছে। কারণ যারাই ক্ষমতাসীন হন, তারা সব সময় নিজেদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেন। তাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি মন্দের ভালো মনে করেন নেতারা।

এ বিষয়ে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার বিষয়টিকে অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। কারণ এ পদ্ধতির সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো মোটামুটি নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু বিগত সরকারের সময় ২০১১ সালে এ পদ্ধতি বাতিলের পর থেকেই মানুষ ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেছে। তবে উন্নত দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধরনের সরকার নেই। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সততা ও স্বচ্ছতা থাকলে এ সরকার ব্যবস্থা দরকার ছিল না। বরং বিষয়টি লজ্জাজনক। তারপরও বলবো, নির্বাচনকালীন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে মন্দের ভালো হিসেবে এটি বহাল থাকুক। এরপর আমরা যখন নৈতিক মানদণ্ড শক্ত করতে পারবো, তখন চাইলে তা ধীরে ধীরে বাদ দেওয়া যেতে পারে।’

বাতিল যেভাবে, পুনর্বহালে আদালতের পর্যবেক্ষণ

মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০১১ সালের সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন হলে নতুন করে আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত নেন সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার সেই আপিল ও রিভিউ মঞ্জুর করে সর্বসম্মত রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। রায়ে সর্বোচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ১৪ বছর আগে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়টি ‘একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ’ বলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে। সেই রায় সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হলো। সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছদ ২ (ক)-এর নির্দলীয় সরকার–সম্পর্কিত বিধানবলি, যা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনের ৩ ধারায় সন্নিবেশিত হয়েছিলো। এই রায়ের মাধ্যমে তা পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো। তবে সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার–সম্পর্কিত বিধানবলি শুধু ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে কার্যকর হবে।

যেভাবে আইনি ভিত্তি পায়

দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হওয়ার পর ১৯১১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরই মধ্যে ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনটি শূন্য হয়। উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। এরপর আওয়ামী লীগ ও জামায়য়াত ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকার প্রথমে এ দাবিকে পাত্তা দেয়নি। যদিও আন্দোলনের মুখে এ পদ্ধতি সংবিধানে যোগ করতে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি। এ সংক্রান্ত সরকারের বিধান সংবলিত বাংলাদেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন আইন, ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ ষষ্ঠ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২৬৮ -০ ভোটে পাস হয়। ২৮ মার্চ রাষ্ট্রপতির সম্মতিলাভের পর এটি আইনে পরিণত হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে চতুর্থ ভাগে “২ক পরিচ্ছদ: নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার” নামে নতুন পরিচ্ছেদ যোগ হয়৷ এতে ৫৮ (ক), ৫৮ (খ) ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) নামে নতুন অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত হয়। এছাড়া সংবিধানের ৬১, ৯৯, ১২৩, ১৫৭, ১৫২ অনুচ্ছেদসহ তৃতীয় তফসিলের বিধান সংশোধন করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংশোধনী অনুযায়ী দু’ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়- কোনও কারণে সংসদ ভেঙে দেওয়া হলে ১৫ দিনের মধ্যে। মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয় যেসব নির্বাচন

এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাস হলে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে দেশে সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়।

কীভাবে দেখছেন রাজনৈতিক নেতারা

বিএনপির স্থায়ী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।’ বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বটতলায় একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগামী নির্বাচনকে আরও সুসংহত ও গ্রহণযোগ্য করবে।’

রায়ের পর দলীয় প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে এবং তারা ভোটাধিকার ফিরে পাবেন। এই রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়ে জাতির দীর্ঘদিনের কলঙ্ক মোচন হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এখন পর্যন্ত এই পদ্ধতির নির্বাচনই ছিল সবচেয়ে ভালো নির্বাচন।’

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউন-কে বলেন, ‘সংসদীয় ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও এটি মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে মন্দের ভালো। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ পদ্ধতি চলতে দেওয়া গণতন্ত্রের জন্য বেমানান।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin