সাইপ্রাসে গত সপ্তাহে উন্নতমানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করেছে ইসরায়েল। গত ডিসেম্বর থেকে এ ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার তৃতীয় চালান এটি। তুরস্কের সঙ্গে ক্রমে উত্তেজনা বেড়ে চলার মধ্যে সাইপ্রাসকে এ ব্যবস্থায় সজ্জিত করল ইসরায়েল। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্র মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, লিমাসলের বন্দর দিয়ে একটি ট্রাক ‘বারাক এমএক্স’ ব্যবস্থার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নিয়ে যাচ্ছে। এ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ১৫০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
সাইপ্রাসের সংবাদমাধ্যম রিপোর্টার জানিয়েছে, বারাক এমএক্স ব্যবস্থার সরবরাহ এখন সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরই এটি আকাশ প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
এই সরবরাহের আগে গত জুলাইয়ে ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (আইএআই) বহিঃসম্পর্ক বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট শাই গাল একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন, ইসরায়েলের উচিত সাইপ্রাস নীতি পুনর্বিবেচনা করা এবং সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করা; যাতে এ দ্বীপের উত্তরাঞ্চলকে তুর্কি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থেকে ‘মুক্ত’ করা যায়। বারাক এমএক্স তৈরি করেছে ইসরায়েলি সংস্থাটি।
গাল লিখেছিলেন, ‘ইসরায়েলকে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সমন্বয় করে এ দ্বীপের উত্তর অংশ মুক্ত করার বিকল্প পরিকল্পনা করতে হবে। এতে তুরস্কের পুনরায় সেনা পাঠানোর পথ বন্ধ হবে, উত্তর সাইপ্রাসের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হবে, গোয়েন্দা ও কমান্ড সেন্টারগুলো গুঁড়িয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত তুর্কি বাহিনী সরে যাবে। এর মাধ্যমে সাইপ্রাসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
গ্রিসের সঙ্গে একীভূত করার লক্ষ্য নিয়ে সাইপ্রাসে এক অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে সেখানে আক্রমণ চালায় তুরস্ক। সেই থেকে দ্বীপটি দুই ভাগে বিভক্ত—দক্ষিণে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্র ও উত্তরে তুরস্ক-সমর্থিত উত্তর সাইপ্রাস, যা শুধু আঙ্কারার স্বীকৃত।
এখন পর্যন্ত আঙ্কারা নতুন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বারাক এমএক্সে রয়েছে উন্নত নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা। এর থ্রিডি রাডার সর্বোচ্চ ৪৬০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত কার্যকর, যা দক্ষিণ তুরস্কের একটি বড় অংশের আকাশসীমা আয়ত্তে আনতে পারে।
১৯৯৭ সালে দক্ষিণ সাইপ্রাস রাশিয়ার তৈরি দুটি এস–৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার চেষ্টা করলে তুরস্কের সঙ্গে তার যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়। সে সময় আঙ্কারা পুরোদমে সামরিক জবাব দেওয়ার হুমকি দেয়। পরে সে সংকট মেটে গ্রিস ওই ক্ষেপণাস্ত্র নিজেদের ভূখণ্ডে নিয়ে গেলে ও সাইপ্রাস বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে শুরু করলে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আরদা মেভলুতোগলু বলেন, এই ব্যবস্থা এস–৩০০ থেকেও অনেক বেশি বিপজ্জনক। ১৯৯৭ সালে রাশিয়া থেকে সাইপ্রাস যে এস–৩০০ অর্ডার দিয়েছিল, তা কখনো মোতায়েন করা হয়নি। ইসরায়েল ও গ্রিসের সঙ্গে সাইপ্রাসের বর্তমান সামরিক ঘনিষ্ঠতার কারণে এ শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও রাডার পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
মেভলুতোগলুর মতে, বারাক এমএক্স শুধু সাইপ্রাসেই নয়, পুরো পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের বিমান ও স্থলবাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এর রাডার ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত কামান, মর্টার ও রকেট হামলাও শনাক্ত করতে সক্ষম।
তবে রিপোর্টারের খবরে বলা হয়েছে, সাইপ্রাসে সরবরাহ করা সংস্করণে বারাক এমএক্সের সব বৈশিষ্ট্য না–ও থাকতে পারে। কারণ, প্রতিটি গ্রাহক দেশের জন্য ইসরায়েলি ব্যবস্থাটি আলাদাভাবে কাস্টমাইজ করা আছে।
তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির উপ–চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল ইয়াঙ্কি বাগসিওগলু সাইপ্রাসে ইসরায়েলি এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইয়াঙ্কি বাগসিওগলু বলেন, ‘এ পদক্ষেপ পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও সাইপ্রাসের নাজুক ভারসাম্য নষ্ট করবে। পাশাপাশি সরাসরি তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’
অন্যদিকে সাইপ্রাসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভাসিলিস পালমাস গতকাল মঙ্গলবার এ সরঞ্জাম কেনার পক্ষে সাফাই দেন। তিনি বলেন, তুরস্ক এখনো দ্বীপটি দখল করে রেখেছে। তাই তাঁর সরকারের দায়িত্ব হলো, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা।
বারাক এমএক্স কেনা ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পালমাস বলেন, সাইপ্রাসের অস্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সার্বভৌম বিষয়। তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে কোনো সংঘাত আমাদের উদ্বেগের বিষয় নয়। আমরা শুধু আমাদের অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। আমাদের মূল দায়িত্ব নিজেদের সুরক্ষা দেওয়া।’
তুরস্কের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্র দেশটির গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, বারাক এমএক্স এখনো পরীক্ষার পর্যায়ে আছে। পাফোস বিমানঘাঁটিতে ব্যবস্থাটির পরীক্ষা চলছে। এখনো এটি পূর্ণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়নি। সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলের পরবর্তী চালানগুলোও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তুরস্ক।