ভারতের রাজস্থানে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা কাশির সিরাপ খেয়ে দুই শিশুর মৃত্যু ও অন্তত ১০ শিশুর অসুস্থতার খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে আরও বিতর্ক সৃষ্টি হয় যখন এক চিকিৎসক নিরাপদ প্রমাণ করতে নিজেই ওষুধটি সেবন করে অচেতন হয়ে পড়েন ও আট ঘণ্টা পর গাড়ি থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।
রাজস্থানের স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কেসন ফার্মা নামের একটি কোম্পানি রাজ্য সরকারের জন্য যে জেনেরিক কাশির সিরাপ তৈরি করেছিল, তাতেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। সিরাপে ডেক্সট্রোমেথরফান হাইড্রোব্রোমাইড নামক যৌগ রয়েছে।
রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সিকার জেলার ৫ বছরের শিশু নিতীশ সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে তাকে চিরানা কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসক কাশির সিরাপ প্রেসক্রাইব করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার মা ওষুধটি খাওয়ানোর পর রাত ৩টার দিকে শিশুটি ঘুম থেকে জেগে ওঠে ও পানি খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর শিশুটি আর জেগে ওঠেনি।
শিশুটির চাচা প্রিয়াকান্ত শর্মা বলেন, নিতীশ সেদিন একেবারেই স্বাভাবিক ছিল, এমনকি সন্ধ্যায় নবরাত্রির অনুষ্ঠানেও গিয়েছিল। রাতে কাশি বেড়ে যাওয়ায় আমরা ডাক্তার দেওয়া ওষুধ খাইয়ে দিই। সকালে যখন সে জাগছিল না, তখন হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরা আমার ভাতিজাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ভরৎপুর জেলার মালহা গ্রামে দুই বছরের সম্রাট জাতব একই কাশির সিরাপ খাওয়ার পর মারা যায়। সম্রাটের সঙ্গে তার বোন সাক্সি ও চাচাতো ভাই ভিরাট- একই ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারা কয়েক ঘণ্টা পর জেগে ওঠে ও বমি করে, কিন্তু সম্রাটের আর জ্ঞান ফেরেনি। প্রথমে ভরৎপুর ও পরে জয়পুরের জেক লন হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো যায়নি।
সম্রাটের দাদী নেহনি জাতব বলেন, আমরা বুঝতেই পারিনি ওষুধটি এত বিপজ্জনক হতে পারে। তিন নাতি-নাতনি একসঙ্গে সিরাপ খেয়েছিল। দুজন বেঁচে গেলেও সম্রাটকে হারালাম।
এদিকে, ভরৎপুরের পাশের বায়ানা এলাকায় তিন বছরের গগন কুমার একই সিরাপ খেয়ে অসুস্থ হলে তার মা চিকিৎসক তারাচাঁদ যোগী’র কাছে অভিযোগ জানান। নিরাপদ প্রমাণ করতে আত্মবিশ্বাসী ডাক্তার নিজেই ওষুধ খান ও অ্যাম্বুলেন্স চালক রাজেন্দ্রকেও খেতে দেন।
ওষুধ খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ডা. যোগী গাড়ি চালাতে গিয়ে ঘুম ঘুম অনুভক করেন ও একপর্যায়ে রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করে অচেতন হয়ে পড়েন। পরিবারের লোকজন তার অবস্থান ট্র্যাক করে আট ঘণ্টা পর তাকে উদ্ধার করে। ওদিকে, অ্যাম্বুলেন্সচালক রাজেন্দ্রও তিন ঘণ্টা পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবে তারা দুজনই চিকিৎসার পর সেরে ওঠেন।
এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে রাজস্থানের বান্সওয়ারা জেলাতেও এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী আটটি শিশু একই কাশির সিরাপ খেয়ে অসুস্থ হয়েছে। স্থানীয় সরকারি শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. প্রদ্যুমন জৈন বলেন, শিশুরা মূলত শ্বাসকষ্ট ও ঘুমঘুম অবস্থায় পড়েছিল। বেশিরভাগই চিকিৎসার পর সেরে উঠেছে। একজন ছয় বছরের শিশুর অবস্থা গুরুতর ছিল, তবে সেও সুস্থ হয়ে গেছে।
এদিকে, ঘটনার পর রাজস্থান সরকার কেসন ফার্মার তৈরি ২২ ব্যাচের কফ সিরাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ও এর বিতরণ বন্ধ করেছে। কর্মকর্তাদের মতে, গত জুলাই থেকে রাজ্যে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার বোতল এই সিরাপ দেওয়া হয়েছে। জয়পুরের এসএমএস হাসপাতালে এখনো ৮ হাজার ২০০ বোতল মজুত রয়েছে, তবে সেগুলো আর ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজস্থান মেডিক্যাল সার্ভিসেস করপোরেশনের নির্বাহী পরিচালক জয় সিং বলেন, ২২ ব্যাচের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এই ওষুধের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের ড্রাগ কন্ট্রোলার অজয় পাঠক জানান, ২০২৩ সালে নিম্নমানের মেন্থল থাকায় একই কোম্পানির তৈরি একটি কাশির সিরাপ নিষিদ্ধ হয়েছিল।
এনডিটিভি কেসন ফার্মার কারখানায় গিয়ে তালা ঝুলতে দেখে। কোম্পানির মালিক বীরেন্দ্র কুমার গুপ্তর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র: এনডিটিভি
এসএএইচ