সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলকে মধ্যরাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ১০ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড়। কেন পরোয়ানা ছাড়া গভীর রাতে একজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলে বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিতে হবে কেন? প্রশ্নগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আটক অবস্থা থেকে ছাড়ার আগে তার কাছ থেকে নেওয়া মুচলেকা নিয়েও সমালোচনা করে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নৈতিক জায়গায় এ ধরনের সংস্কৃতির যে পরিবর্তন হবে বলে আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আশা করা হয়েছিল, সেটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।
ঘটনার পেছনের ইঙ্গিত, অতঃপর…
সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলকে কেন তুলে নেওয়া হলো সেই ইঙ্গিত রাত থেকেই পোস্টে পোস্টে ঘুরতে থাকে। কোনও এক ‘বিশেষ সহকারীর’ সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে পোস্ট দেন কেউ কেউ। ভোর পর্যন্ত কেবল সোহেলের পক্ষেই জানানো সম্ভব—কেন তুলে নেওয়া হলো তাকে। অথচ ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাখ্যা এলো, ‘সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলকে মধ্যরাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের কোনও সম্পর্ক নেই।’
বুধবার (১৯ নভেম্বর) মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহম্মদ জসীমউদ্দিন সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সেখানে দাবি করা হয়, এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার) বাস্তবায়নের সঙ্গে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে জড়িয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে সত্যের অপলাপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই আমরা এনইআইআর বাস্তবায়ন করছি। অবৈধ হ্যান্ডসেটের লাগাম টানতে সংক্ষুব্ধ পক্ষের সঙ্গে বিটিআরসি বৈঠকও করেছে। এত কিছুর পরও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে কোনও কোনও গণমাধ্যম আমার ওপর দায় চাপিয়েছে। তাদের উদ্দেশেই আমার বক্তব্য- এটা অনভিপ্রেত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাজ করে। এখানে আমার কোনও সংশ্লিষ্টতা থাকার অবকাশই নেই।‘
কিন্তু এবার আর কোনও বাইরের কারোর পোস্ট না, ১০ ঘণ্টা পরে বাসায় ফিরে ভুক্তভোগী সাংবাদিক সোহেল সেই ইঙ্গিতকেই স্পষ্ট করে লিখলেন, ‘আজ (বুধবার) ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) নিয়ে ডিআরইউতে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর প্রেস কনফারেন্স করার কথা ছিল। আমি সেখানে ছিলাম মিডিয়া পরামর্শক। সেই প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল।’
তিনি লেখেন, ‘দেশের মুক্তবাণিজ্য নীতির সঙ্গে এনইআইআর স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দেশে প্রতিযোগিতা কমিশনও রয়েছে। অথচ মাত্র ৯ জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারা দেশে ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসানোর গভীর চক্রান্ত চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে গ্রামের সাধারণ মানুষ, প্রবাসীসহ অনেকেই বিপদে পড়বেন। একটা চেইন ভেঙে পড়বে। অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে যাবে। জেনে রাখা ভালো, এই ৯ জনের একজন ওই উপদেষ্টার স্কুলবন্ধু। একটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে সরকার কেন ভয় পায়? শুধুমাত্র প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতেই কি আমাকে গভীর রাতে জোর করে তুলে নিতে হলো?…’
কেন মুচলেকা, জবাব মেলেনি
প্রায় ১০ ঘণ্টা পর বাসায় ফিরে মিজানুর রহমান সোহেল জানান, ভুল বোঝাবুঝির কারণে তাকে আনা হয়েছিল, এমন মুচলেকা তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। মুচলেকা দিয়ে বের হওয়া প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মিজানুর রহমান সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে মুচলেকা দিতে বললে আমি তাদের জানাই; মুচলেকা সাইন করতে হলে আমাকে তার কপি দিতে হবে। কিন্তু সেটা তারা দেবে না। এক ধরনের জোর করা আর কী। তারা আমাকে মুচলেকা দেওয়ার বিষয়ে আইনের কথা বলছে। কিন্তু যখন আমাকে আটক করে আনলো তখন আইন মেনে সেটা করেনি। কারও নামে পরোয়ানা না থাকলে বাসা থেকে তুলে আনা যায় কিনা সেটা ভাবেনি। মুচলেকা তারা নিজেদের মতো করে লিখেছে, সেটা তো আর আমার কথায় চেঞ্জ করবে না।’
যদিও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স) মুহাম্মদ তালেবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনও মুচলেকার বিষয়ে আমি অবহিত নই।’
মুচলেকা মূলত একটি আইনি অঙ্গীকারনামা, কোনও ব্যক্তি যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ না করে, তা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়। এটি ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০৬, ১০৭, ১০৮ ও ১০৯-এর অধীনে নির্ধারিত হয়। এই ধারাগুলোতে বন্ড বা মুচলেকা প্রদানের কারণ এবং বিধান আলোচনা করা হয়েছে। ধারা ১০৭-এ বলা আছে, কোনও ব্যক্তি যদি এমন কাজ করতে পারে, যা শাস্তি বা জনশৃঙ্খলার জন্য বিপজ্জনক, তাহলে তাকে শান্তি ও সদাচরণের জন্য বন্ড সই করতে হতে পারে। এই ধারার অধীনে বন্ডের মেয়াদ সাধারণত ৬ মাস থেকে ১ বছর হয়ে থাকে। ১০৮ নম্বর ধারায় বলা আছে, কোনও ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয়ে কাউকে প্ররোচনা দেয়, তবে তাকে সদাচরণের জন্য বন্ড সই করতে হতে পারে। এই ক্ষেত্রে ঠিক কোন ধারা সংবলিত মুচলেকা বিধান নির্ধারিত হয়েছে তা জানা যায়নি।
জিজ্ঞাসাবাদের নামে এরকম সাংবাদিক আটকের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, ‘ঘটনা তো সেই আগের মতোই হলো। এখন দেখছি মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। গভীর রাতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ব্যতিরেকে তুলে নিয়ে আসছে। মধ্যরাত থেকেই ঐক্যবদ্ধভাবে এর প্রতিবাদ ও সমালোচনা যদি না হতো, তাহলে হয়তো যেনতেন বা কঠিন মামলা দিয়ে বন্দি করা হতো। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজন নাগরিককে আপনি অন্য অনেক উপায়ে ডেকে আনতে পারেন। আর ডেকে আনার পরে তার সঙ্গে আলাপ শেষে যখন ছেড়ে দেবেন তখন মুচলেকা কেন রাখতে হবে?’
তিনি আরও বলেন, ‘নৈতিক জায়গায়, সংস্কৃতির যে পরিবর্তন হবে বলে মনে করেছিলাম; সেই পথ থেকে আমরা অনেক সরে এসেছি।’