ভূমিকম্পে ঢাবি'র ১০ হলে ক্ষয়ক্ষতি, ২২ শিক্ষার্থী আহত

ভূমিকম্পে ঢাবি'র ১০ হলে ক্ষয়ক্ষতি, ২২ শিক্ষার্থী আহত

শুক্রবার সকালে দেশে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১০টি হলের দেয়ালে নতুন করে ফাটল ধরেছে এবং পলেস্তারা খসে পড়েছে। প্রায় ২২ জন শিক্ষার্থী আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। বহু শিক্ষার্থী পা মচকে যাওয়া, জ্ঞান হারানো এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।

ভূমিকম্পের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক আবাসিক হলে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হাজি মুহম্মদ মুহসীন হলের— যার কারণে শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ ভবনে থাকার পরিবর্তে খালি কর্মকর্তা কোয়ার্টার দখল করে নিয়েছে। অন্যান্য বেশ কয়েকটি হলেও নতুন ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া এবং ফাঁক বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। হল সংসদের নেতারা গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে জরুরি মেরামত অথবা নতুন করে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের মতে, এগারোটি হলজুড়ে ভূমিকম্পের সময় বাইশ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের কারও কারও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, জ্ঞান হারিয়েছেন বা তাড়াহুড়ো করে রুম বা হল থেকে বের হওয়ার সময় পা মচকে গেছে। আহত শিক্ষার্থীদের হলে অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুর্তজা মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ঝুঁকিতে থাকা হলগুলো

সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি হাজি মুহম্মদ মুহসীন হলে। সেখানে শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। ভবনের অবস্থা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে শিক্ষার্থীরা আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও লাফিয়ে পড়েছেন।

হাজি মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের ভিপি শাদিক হোসেন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই আর হলে থাকতে চায় না, আমরা নিরাপদ স্থানে থাকতে চাই, নতুন ভবন চাই।"

এছাড়াও, এই হলের শিক্ষার্থীরা পলাশীতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কর্মকর্তা কোয়ার্টারে কিছু খালি কক্ষ দখল করে নিয়েছেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন হল সংসদের সমাজকল্যাণ সম্পাদক সাইফুল্লাহ।

সাইফুল্লাহ পরে তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, "স্টাফ বিল্ডিং স্বাধীনতা টাওয়ারের খালি রুমগুলো মুহসীন হলের শিক্ষার্থীরা দখল করে নিচ্ছে। আজ থেকে মুহসীন হলের শিক্ষার্থীরা এখানেই থাকবে।"

একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলেও। হলের একটি ভবন আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ভূমিকম্প সেটাকে আরও খারাপ করে দিয়েছে। সেখানে নতুন ভবনের জন্য বাজেটও পাস হয়েছে।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল সংসদের ভিপি তারেকুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "আমাদের এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ের অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল। তবে ভূমিকম্পের জন্য ফাটল আরো বেড়ে গেছে। সেখানে নতুন বিল্ডিং বানানোর অনুমোদনও হয়েছে। আমরা চাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হোক।"

গত সপ্তাহের মধ্যেই শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং কবি জসীমউদ্দীন হলে পলেস্তারা খসে পড়েছিল। কোনও শিক্ষার্থী আহত না হলেও তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। শুক্রবারের ভূমিকম্প অবস্থা আরও খারাপ করে দিয়েছে।

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবিব ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "আমাদের হলে অনেকগুলো ফাটল দেখা গেছে, কোথাও রুমে, কোথাও দেয়ালে, কোথাও পিলারে। আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।"

কবি জসীমউদ্দীন হল সংসদের ভিপি ওসমান গনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ভূমিকম্পের কারণে বেশ কয়েকটি দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং দুটি কক্ষ থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। তিনি বলেন, "আগের দিন রাত ৩টায় আরেকটি রুমে পলেস্তারা খসে পড়েছিল, যখন শিক্ষার্থীরা ঘুমিয়ে ছিল। সারারাত শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত ছিল।"

আরও বেশ কয়েকটি হলে দেয়ালে নতুন ফাটল ধরা এবং পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

এ এফ রহমান হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক হাবিব উল্লাহ জানান, "আমাদের ১০৫ নং কক্ষ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে, দুইজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে এবং নতুন রিডিংরুমে ফাটল দেখা গেছে।"

শামসুন্নাহার হল সংসদের ভিপি কানিজ কুররাতুল আইন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "আমাদের হলের মধ্য ভবনের বারান্দায় যে গ্যাপ ছিল সেটা বেড়ে গেছে, বেশ কিছু জায়গায় ফাটল ধরেছে এবং পলেস্তারা খসে পড়েছে।"

সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা আক্তার চৌধুরী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "আমাদের হলের প্রত্যাশা ভবনের একটা রুমে এবং প্রদীপ্ত ভবনের একটা বারান্দায় ফাটল দেখা গেছে।"

ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি আবু নায়েম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "আমাদের হলে দুইটা ফ্লোরে ফাটল দেখা গেছে।"

বিজয় একাত্তর হলের সাধারণ সম্পাদক আশিক বিল্লাহ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, "হলের এক জায়গায় ফাটল দেখা গেছে, তবে খুব বেশি বড় না।"

কুয়েত মৈত্রী হল সংসদের ভিপি রাফিয়া রেহনুমা জানান, "আমাদের হলে ভূমিকম্পের কারণে কোনো ফাটল দেখা যায় নি তবে দুইটা জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। আমরা প্রায় সাথে সাথেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী বিভাগকে জানাই এবং তারা দুই দফায় এসে দেখার পর বলেন, কোনও 'লাইফ হ্যাজার্ড' নেই, প্লাস্টার করলেই ঠিক হয়ে যাবে।"

আঘাত এবং আতঙ্ক

মোট ২২ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন—এর মধ্যে হাজি মোহাম্মদ মুহসীন হলে ৬ জন, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ৩ জন, বিজয় একাত্তর হলে ২ জন, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২ জন, স্যার এ এফ রহমান হলে ২ জন, কবি জসীম উদ্দীন হলে ২ জন এবং বেগম রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল, মাস্টারদা সূর্য সেন হল ও ফজলুল হক মুসলিম হলে ১ জন করে।

এই তথ্য ঢাকা ট্রিবিউনকে দিয়েছেন ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মিনহাজ।

মিনহাজ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, এই সংখ্যাটা যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের। "কিছু শিক্ষার্থীকে হলে পাঠানো হয়েছে, কাউকে ঢাবির মুর্তজা মেডিক্যাল সেন্টারে পাঠানো হয়েছে এবং কারও কারও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, ভূমিকম্পের কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়েছেন, জ্ঞান হারিয়েছেন এবং পা মচকে গেছে।

Comments

0 total

Be the first to comment.

রাকসু নির্বাচনে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনার দাবি ছাত্রদলের BanglaTribune | আমার ক্যাম্পাস

রাকসু নির্বাচনে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনার দাবি ছাত্রদলের

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনাসহ ১২ দফা দাবি জানিয়েছ...

Sep 14, 2025

More from this User

View all posts by admin