যেসব দেশে পরিচ্ছন্নতার জন্য আছে আইন, না মানলে জেল-জরিমানা

যেসব দেশে পরিচ্ছন্নতার জন্য আছে আইন, না মানলে জেল-জরিমানা

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুধু স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং একটি দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলার প্রতিফলন। রাস্তাঘাটে ময়লা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানে কেবল অস্বস্তি নয়, বরং রোগবালাই, পরিবেশদূষণ এবং সামাজিক অব্যবস্থার জন্ম দেওয়া। তাই বিশ্বের অনেক দেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। কোথাও আইন করে কঠোর জরিমানা বা শাস্তি দেওয়া হয়, আবার কোথাও নাগরিকদের উৎসাহিত করতে পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সিঙ্গাপুরকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশগুলোর একটি। এই খ্যাতির পেছনে রয়েছে কঠোর আইন ও সরকারের নজরদারি। যদি কেউ রাস্তায় সিগারেটের টুকরা, চুইংগাম বা খাবারের মোড়ক ফেলে, তাহলে তাকে দিতে হয় প্রথমবারে প্রায় ৩০০ ডলার জরিমানা। পুনঃরায় একই কাজ করলে শাস্তি আরও বাড়ে। জরিমানার পাশাপাশি অপরাধীকে জনসম্মুখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়। চুইংগাম পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে সীমিতভাবে বিক্রি হয়, কারণ এর অবশিষ্টাংশ রাস্তার সৌন্দর্য নষ্ট করে।এই কঠোরতার ফলেই সিঙ্গাপুরকে আজ বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর বলা হয়।

জাপানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুধু আইন নয়, বরং সংস্কৃতির অংশ। জাপানের রাস্তায় পাবলিক ডাস্টবিন খুব কমই পাওয়া যায়। প্রত্যেক মানুষ নিজের ময়লা নিজেই বাসায় নিয়ে যায়। স্কুল থেকেই শিশুদের শেখানো হয়, তারা নিজের শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ বা আশপাশ নিজেরাই পরিষ্কার করবে। যদিও আইনগতভাবে শাস্তির ব্যবস্থা আছে, তবুও সামাজিক চাপ এতটাই প্রবল যে কেউ প্রকাশ্যে ময়লা ফেলতে সাহস পায় না। জাপানের এই সংস্কৃতির কারণে বড় শহরগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে ঝকঝকে-তকতকে থাকে। এমনকি পোষা কুকুর বা বিড়াল নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে বের হলে সঙ্গে পলিথিন নিয়ে বের হতে হয়। যদি আপনার পোষা বিড়াল বা কুকুর রাস্তাত মলত্যাগ করে তাহলে সেটা আপনাকে পরিষ্কার করে বাড়ি নিয়ে আসতে হবে।

ইউরোপের অনেক দেশই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদাহরণ তৈরি করেছে। এর মধ্যে জার্মানি ও সুইডেন সবার আগে আসে। এখানে আবর্জনা আলাদা আলাদা করে ফেলতে হয়-প্লাস্টিক, কাচ, কাগজ, জৈব বর্জ্য আলাদা বিনে রাখতে হয়। আইন ভেঙে এলোমেলোভাবে ময়লা ফেললে মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়। জার্মানিতে বোতল ফেরত দেওয়ার নিয়ম আছে, যাকে বলা হয় পিফান্ড সিস্টেম। এতে বোতল ফেরত দিলে টাকা ফেরত পাওয়া যায়, ফলে মানুষ বর্জ্য ফেলে না। সুইডেন আবার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এতটাই সফল যে প্রতিবেশী দেশগুলোর আবর্জনাও আমদানি করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শুধু আকাশচুম্বী বিল্ডিংয়ের জন্য নয়, পরিচ্ছন্নতার জন্যও বিখ্যাত। রাস্তায়, সমুদ্র সৈকতে বা পার্কে আবর্জনা ফেললে দিতে হয় ৫০০ দিরহাম পর্যন্ত জরিমানা। গাড়ির জানালা দিয়ে কিছু ফেলে দিলে জরিমানার পাশাপাশি ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। দুবাইতে নিয়মিত ‘ক্লিন ক্যাম্পেইন’ হয়, যেখানে নাগরিকরা অংশ নেয়।

আফ্রিকার ছোট্ট দেশ রুয়ান্ডা পরিচ্ছন্নতার এক অসাধারণ উদাহরণ। প্রতি মাসের শেষ শনিবার পালন করা হয় ‘ইউমুগান্ডা’ নামের বিশেষ দিবস। এদিন সরকার থেকে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী-সবাই মিলে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করে, গাছ লাগায় বা ড্রেন পরিষ্কার করে। এতে অংশগ্রহণ করা সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়, আর যারা অংশ নেয় তারা সমাজে সম্মানিত হয়। ফলে দেশটির রাজধানী কিগালি আজ আফ্রিকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিত।

ভারতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বড় আন্দোলন শুরু হয়েছে। ২০১৪ সালে শুরু হয় ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’। এর মাধ্যমে বিভিন্ন শহরকে পরিষ্কার রাখার জন্য প্রতিযোগিতা করানো হয়। ইন্দোর, সুরাট, ভোপালের মতো শহরগুলো ধারাবাহিকভাবে পরিচ্ছন্নতার পুরস্কার জিতে আসছে। স্থানীয় সরকার পরিচ্ছন্নতায় অবদান রাখা নাগরিক ও সংগঠনকে সম্মাননা দিয়ে থাকে।

পরিচ্ছন্নতা শুধু আইন নয়, অভ্যাসও। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। মানুষকে সচেতন করা, সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পরিচ্ছন্নতাকে গ্রহণ করানো আরও বেশি কার্যকর। সিঙ্গাপুরের মতো দেশ কঠোর শাস্তি দিয়ে পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করেছে। জাপান শাস্তির চাইতে সামাজিক চাপে মানুষকে দায়িত্বশীল করেছে। আবার রুয়ান্ডার মতো দেশ নাগরিকদের উৎসবে রূপান্তর করেছে।

আরও পড়ুন

সূত্র: প্লাস্টিক বাস্টার, গোঅ্যাব্রড

কেএসকে/এমএস

Comments

0 total

Be the first to comment.

৩৪ বছর হাতের নখ কাটেন না তিনি Jagonews | ফিচার

৩৪ বছর হাতের নখ কাটেন না তিনি

অনেকেই নখ বড় রাখতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে নারীরা। নানান রঙের নেইলপলিশ দিয়ে বড় নখ সাজান। সৌন্দর্যের এক...

Sep 25, 2025

More from this User

View all posts by admin