কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধে একটি আইনের খসড়া ঝুলছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। খসড়ার ওপর পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত দিতে পারবেন যে কেউ। কিন্তু কতদিন এটা এভাবে মতামতের জন্য থাকবে, সে বিষয়ে জানাতে পারেননি কেউ। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ২০০৯ সালে হাইকোর্টের যৌন হয়রানিবিরোধী নীতিমালা প্রণয়নের সময়ই এর আলোকে একটি আইন করার কথা বলা ছিল। এরপর ১৬ বছরেও এই কাজটি না হওয়া হতাশাজনক। তবে যে খসড়াটি হয়েছে সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তারা।
বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। হয়রানির কারণে কেউ ছেড়ে দিচ্ছেন পড়ালেখা তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবার কেউ ছেড়ে দিচ্ছেন চাকরিসহ কর্মক্ষেত্র। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জরিপে জানা গেছে, ২০২৫ সালে শুধু জানুয়ারি মাসেই উত্ত্যক্তকারীদের মাধ্যমে ১১ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ১৬৫টি এবং ২০২৩ সালে ঘটেছে ১৪২টি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২০ সালের জরিপে বলা হয়েছে, প্রায় ৪৩ শতাংশ নারীর কর্মস্থলে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। কর্মক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ নারীকর্মী শারীরিক বা মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ জানালে কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ নেয় না বা বিষয়টি উপেক্ষা করে।
কী আছে আইনে
এই আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এটি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০২৪ নামে অবহিত হবে। আইনে শিশু অর্থ শিশু আইন ২০১৩-এর ৪ ধারায় বর্ণিত শিশুকে বোঝাবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আদালতের নীতিমালাকে ভিত্তি ধরে মূলত আইনের খসড়াটি করা হয়েছে। খসড়া আইনে যৌন হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণ এবং তদন্ত পরিচালনা ও সুপারিশের জন্য প্রতিটি কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ তদন্ত প্রক্রিয়া, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, কোন কোন কাজ যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য হবে এবং মিথ্যা অভিযোগ ও সাক্ষ্য দেওয়ার শাস্তিসহ বিভিন্ন বিষয় খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তিরস্কার, মৌখিক ও লিখিত সতর্কীকরণ, টাইমস্কেল বন্ধ, বাধ্যতামূলক অবসর থেকে চাকরিচ্যুতির কথা বলা আছে। অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারা গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কোনও ব্যক্তি, লিখিতভাবে এই সিদ্ধান্তের ৩০ দিনের মধ্যে এখতিয়ার সম্পন্ন জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন।
কোনটাকে বলা হবে যৌন হয়রানি
আইনের খসড়ায় যেসব কাজ যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য হবে তার একটি তালিকা তৈরি করেছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক সংস্পর্শ এবং যৌনতার জন্য অগ্রসর হওয়া বা এ ধরনের প্রচেষ্টা, যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্রশাসনিক, কর্তৃত্বমূলক বা পেশাদারি ক্ষমতার অপব্যবহার, যৌন অনুগ্রহের দাবি, কিংবা অনুরোধ জানানো, ভয়, প্রতারণা বা মিথ্যা আশ্বাসের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার প্রচেষ্টা, যৌনতা বিষয়ক মন্তব্য, বক্তব্য, তামাশা বা অন্যান্য মৌখিক ক্রিয়াকলাপ, যাতে যৌনতার প্রভাব বিদ্যমান, পর্নোগ্রফি দেখানো বা যৌনতাপূর্ণ বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কোনও বস্তু প্রদর্শন, কোনও কামুক দৃষ্টি, শিস দেওয়া বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কোনও অঙ্গভঙ্গি, ব্ল্যাকমেইলিং বা মর্যাদাহানির উদ্দেশ্যে কারও স্থির বা ভিডিওচিত্র ধারণ ও সংরক্ষণ, প্রদর্শন, বিতরণ, বিপণন ও প্রচার বা প্রকাশ করা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কোনও বস্তু, ছবি, শব্দ, ইমেইল, টেক্সট বার্তা, খুদেবার্তা বা লিখিত নোট ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে যৌন সম্পর্কযুক্ত আপত্তিকর কোনও তথ্য বা বিষয় প্রকাশ করা বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আপত্তিকর বার্তা পাঠানো বা কোনও অশালীন মন্তব্য করা, কারও জেন্ডার পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কটূক্তি করা বা অপমানজনক মন্তব্য করা, একজন ব্যক্তির জেন্ডার পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে পিতৃতান্ত্রিক ধারণাপ্রসূত অবমাননাকর মন্তব্য করা এবং অন্য যেকোনও আচরণ, যা যৌন হয়রানির সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে বলা হয়।
এই আইন আরও আগে হওয়া উচিত ছিল উল্লেখ করে নারী অধিকারকর্মী খুশি কবীর বলেন, ‘এতদিন এত রকমের যৌন হয়রানির ঘটনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরেও আইন যে হয়নি এটা আমাদের দুর্বলতা। বর্তমান সরকার আইন করতে পারবে না, অধ্যাদেশ করে বিষয়টা করতে পারবে। চূড়ান্ত হয়ে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে তো পারবে। প্রয়োজন খুব বেশি, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেক হয়রানির খবর আমরা পাই, সেগুলো নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না। আইন হলে সেটা বলতে সাহস পাবে। মনে রাখতে হবে, নির্দেশনা (যেটা হাইকোর্ট দিয়েছিল) সবাই জানেও না, প্রয়োগে বাধ্য করে না। আইন থাকলে প্রয়োগে বাধ্য করা যায়।
আইনের খসড়ার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মমতাজ আহমেদ বলেন, ‘খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে জনমত নেওয়া হচ্ছে।’