দুই বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বর্ষপূর্তিতে মঙ্গলবার গাজার বিভিন্ন স্থানে ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ ও জেট বিমানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। কোনও যুদ্ধবিরতি কার্যকর না থাকায় হামলার তীব্রতা থামেনি, বরং বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতেই মিসরের শার্ম আল-শেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসেছে ইসরায়েল ও হামাস। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনুস ও উত্তর গাজা শহরে রাতভর আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে গোলাবর্ষণের খবর দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, গাজা থেকে রকেট হামলার জবাবে তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছে। সীমান্তবর্তী নেটিভ হাসারা কিবুটজে বিমান হামলার সতর্ক সাইরেন বাজে।
এদিকে, ইসরায়েলে হামাসের ২০২৩ সালের হামলার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ হয়েছে। তেল আবিবের ‘হোস্টেজেস স্কয়ার’ ও নোভা সঙ্গীত উৎসবস্থলে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ওই উৎসবে হামলায় নিহত হন ৩৬৪ জন ইসরায়েলি।
শান্তি প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারী কাতার জানিয়েছে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় বাস্তব প্রয়োগের জন্য বহু ধাপ এখনও স্পষ্ট নয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, পরিকল্পনায় ২০টি ধারা রয়েছে, প্রতিটি ধারারই মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সেটির ব্যাখ্যা দরকার।
তিনি আরও বলেন, হামাস যদি ২০২৩ সালের হামলায় জিম্মি করা ইসরায়েলিদের ফিরিয়ে দেয়, তবে সেটিই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে পারে।
গাজায় এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের এক-তৃতীয়াংশ শিশু। অঞ্চলটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
গাজার বাসিন্দা মোহাম্মদ দিব বলেন, দুই বছর ধরে আমরা ভয়, মৃত্যু আর গৃহহীনতার মধ্যে বেঁচে আছি। এখন শুধু শান্তির আশাই বাকি।
এক মাস আগে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসরায়েল সেই প্রতিবেদনকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও কলঙ্কজনক’ বলে নাকচ করেছে।
সহিংসতার মধ্যেই ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, এখনই সুযোগ জিম্মিদের মুক্তি ও যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের। এই মুহূর্তটি কাজে লাগাতে হবে, যাতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক স্থায়ী শান্তির পথ তৈরি হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, হামাস নেতাদের টার্গেট করে হত্যা এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ওপরও হামলা চালায়। এতে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও নিহত হন এবং ইসরায়েল কিছু সময়ের জন্য মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালায়।
এই যুদ্ধ ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমবর্ধমানভাবে বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই ট্রাম্পের প্রস্তাবের মূল কাঠামোতে সম্মতি জানিয়েছে। এর অধীনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে। আরব ও পশ্চিমা দেশগুলোরও এ পরিকল্পনায় সমর্থন রয়েছে।
তবে কাতারের মতে, পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করছে সরেজমিনের বাস্তবতায় এর প্রয়োগের ওপর। হামাস দাবি করেছে, ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির নিশ্চয়তা ছাড়া কোনও চুক্তি সম্ভব নয়।
আলোচনায় অগ্রগতি হলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে, গাজার ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামো কী হবে এবং কে এর পুনর্গঠন করবে। ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন, হামাসের কোনও ভূমিকাই সেখানে থাকবে না।
এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বলেন, মৃত জিম্মিদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজ সময়সাপেক্ষ হতে পারে, তাই ট্রাম্পের ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বাস্তবে পূরণ করা কঠিন।