ব্রিটেনে হালাল খাবারের বাজার দিনকে দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তাদের জন্য এখানে এক বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাবে তার সুবিধা গ্রহণে পিছিয়ে রয়েছেন তারা।
দেশটির সর্বশেষ কম্পাউন্ড অ্যানুয়াল গ্রোথ রেট সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে হালাল খাবারের বাজারের আর্থিক মূল্য ছিল ৮৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা প্রায় ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪৯ দশমিক ৬১ বিলিয়নে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
এই বাজারে ভোক্তা বৃদ্ধির মূল কারণ হচ্ছে, দেশটিতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্রমবৃদ্ধি, যাদের উপস্থিতি ইতোমধ্যে দেশটির জনসংখ্যার সাড়ে ছয় শতাংশের বেশি।
চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে টেসকো, সেইনসবারি’স এবং অ্যাসডার মতো বৃহৎ সুপারমার্কেটগুলি হালাল পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এর জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বাড়ছে। তবে এই বাজারে সরবরাহকারীদের মধ্যে এক বিশাল ভারসাম্যহীনতা খুবই স্পষ্ট, বিশেষত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা প্রতিযোগিতায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রিটেনে বৈধ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫ জন। বৃহত্তর লন্ডনের মতো অঞ্চলে তারা জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তাদের এই বিশাল উপস্থিতি এবং সমৃদ্ধ রন্ধনশিল্পের ঐতিহ্য সত্ত্বেও, বর্ধনশীল হালাল খাবারের বাজার তারা ধরতে পারছে না।
বিপরীতে, পাকিস্তানি, ভারতীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত বা মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো এই বাজারে অনেকটাই আধিপত্য তৈরি করে ফেলেছে।
তেমনই এক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে তারিক হালাল মিটস লিমিটেড, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা তারিক শেখ। এছাড়া রয়েছে হালুডিস লিমিটেড, যার সহ-প্রতিষ্ঠাতা নোমান খাওয়াজা ও ইমরান কাউসার এবং মালিকানায় রয়েছেন আসিফ রাঙ্গুনওয়ালার মতো ব্যক্তি।
তাহেরা ফুডস লিমিটেডের পরিচালক তালিকায় ব্রিটিশ এবং মার্কিনিরা রয়েছেন, অন্যদিকে কেকিউএফ ফুডস লিমিটেড এবং অন্যান্য কোম্পানিগুলির মধ্যে আব্দুল্লাহ ক্যাটারিং লিমিটেড বা কিউএফ ফুড সার্ভিসেস লিমিটেডের মতো কিছু ক্ষেত্রে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের বংশোদ্ভূত পরিচালকদের দেখা যায়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মালিকানাধীন পর্যাপ্তসংখ্যক ঐতিহ্যবাহী দোকান ও রেস্তোরাঁ থাকলেও, সুপারমার্কেটের উপযোগী ব্র্যান্ডেড, প্রত্যয়িত এবং প্রিমিয়াম প্যাকেজড পণ্যের সরবরাহে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
যে সব কোম্পানি সামান্য অগ্রগতি দেখাচ্ছে, যেমন সেভওয়েজ সুপারস্টোর লিমিটেড এর প্রতিষ্ঠাতা এবং কিউএফ ফুড সার্ভিসেস লিমিটেড বা হিবা হালাল মিটস লিমিটেডের মতো কিছু কোম্পানির পরিচালকদের মধ্যে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ব্যক্তিরা জড়িত থাকলেও, এ খাতে তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এখনও দৃশ্যমান হয়নি।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ
সম্ভাব্য প্রায় দেড়শ বিলিয়ন ডলারের বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হলো খাবারের প্রিমিয়াম কোয়ালিটি এবং বৈচিত্র্য। বিশেষত দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের ব্রিটিশ মুসলিমরা এখন মাংস প্রধান খাবারের বদলে প্রস্তুতকৃত প্যাকেটজাত, স্বাস্থ্যকর এবং ফিউশন খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। এটি হতে পারে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ।
বাঙালি রান্নার ঐতিহ্যবাহী শিল্প কাজে লাগিয়ে এবং উচ্চ মানসম্পন্ন, প্রত্যয়িত, এবং উদ্ভাবনী পণ্য—যেমন বাংলাদেশের উৎস থেকে হিমায়িত মাছ, নির্দিষ্ট আঞ্চলিক স্ন্যাকস ইত্যাদি দিয়ে সরাসরি এই বিশেষ বাজারে সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে পারেন। নেতৃস্থানীয় নিরীক্ষণ সংস্থাগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানসম্মত ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং মূলধারার খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রে জায়গা নিশ্চিত করা গেলে, এটি কেবল একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারই উন্মুক্ত করবে না, বরং যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ-বাংলাদেশি খাদ্য শিল্পকে আন্তর্জাতিক রফতানি বৃদ্ধির জন্যও প্রস্তুত করবে।
এ বিষয়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি চেম্বার অব কর্মার্সের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও জেএমজি কার্গোর কর্নধার মনির আহমদ রবিবার রাতে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ খাতে অবারিত সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্যোক্তা নেই। যুক্তরাজ্যের হালাল খাবারের বাজার দ্রুত বাড়ছে। সামনে এ বাজার আরও বড় হবে। এখানে বিনিয়োগ নিরাপদ ও সাফল্যের বিশাল সম্ভাবনা আছে। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, যুক্তরাজ্যের হালাল বাজার ধরার চেষ্টার পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের প্রিমিয়াম হালাল খাদ্য ব্র্যান্ডগুলির অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হওয়া।