মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে ১৪ সেপ্টেম্বর জেরুজালেমের পবিত্রতম স্থানে ২০০০ বছরের পুরোনো ‘ওয়েস্টার্ন ওয়ালের’ বিশাল পাথরখণ্ডগুলো দেখানোর পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই দেশের জোটকে ‘পাথরের মতোই শক্তিশালী ও মজবুত’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি ভুল।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে ইসরায়েল এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল। চলমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কানাডা ও ফ্রান্সের মতো পুরোনো বন্ধুরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও ইসরায়েলের অব্যাহত বসতি সম্প্রসারণ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে আরও কঠিন করে তুলছে। ইসরায়েলকে একটি ‘একঘরে’ রাষ্ট্র হওয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র একাই রক্ষা করছে। যা কূটনৈতিক, আইনি ও সামরিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ঢেকে আনতে পারে।
নেতানিয়াহু যত আশ্বাসই দিন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক মোটেই খুব বেশি মজবুত নয়। নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনকে ক্ষুব্ধ করেছেন এবং জোটের ভিত্তির গভীরে থাকা ফাটল উপেক্ষা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী এই মিত্র দেশকে সমর্থন থেকে ডেমোক্র্যাটিক ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে সরে আসছেন। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও আস্থা কমছে।
বিপজ্জনক ও প্রতিকূল প্রতিবেশী অঞ্চলে থাকা ১০ মিলিয়ন মানুষের এই ছোট দেশটির জন্য মার্কিন সমর্থনের আকস্মিক পতন হবে এক বিপর্যয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপগুলো চমকে দেওয়ার মতো। ফিলিস্তিনিদের চেয়ে ইসরায়েলকে সমর্থনকারী আমেরিকানদের সংখ্যা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২ সালে ৪২ শতাংশ আমেরিকান ইসরায়েল সম্পর্কে প্রতিকূল মনোভাব পোষণ করতেন; বর্তমানে সেই হার ৫৩ শতাংশ।
ইউগভ/ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। গত তিন বছরে ৫০ বছরের বেশি বয়সী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েল-বিরোধী মনোভাব ২৩ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। ৫০ বছরের কম বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন এখন সমানভাবে বিভক্ত, যা ২০২২ সালে ইসরায়েলের পক্ষে ৬৩ শতাংশ ছিল।
২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টানদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের চেয়ে ইসরায়েলিদের সমর্থন করার হার ৬৯ শতাংশ থেকে খুব দ্রুত কমে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক একসময় মূল্যবোধ ও স্বার্থের এক শক্তিশালী মিশ্রণ ছিল। দুটিই ছিল গণতন্ত্র, যা নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে আসা মানুষের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তারা উভয়ই বিশ্বাস করত যে তাদের দেশ ব্যতিক্রমী। একই সময়ে, তাদের স্বার্থের মধ্যে মিল ছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ইসরায়েল আরব বিশ্বে সোভিয়েত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি ঢাল ছিল। সোভিয়েত পতনের পরও তারা ইরানের বিরুদ্ধে মিত্র ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর তারা ইসলামপন্থি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের কারণে ঐক্যবদ্ধ ছিল।
ডেমোক্র্যাটদের, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই ফাটলের প্রধান কারণ হলো মূল্যবোধ। তারা আমেরিকার দাসত্ব এবং নব্য-উপনিবেশবাদের ইতিহাস নিয়ে তাদের ক্ষোভকে অত্যাচারিত ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর আরোপ করছে। ইসরায়েলি রাজনীতিতে ডানপন্থিদের উত্থান এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে দৃঢ়ভাবে রিপাবলিকান শিবিরে ঠেলে দিয়েছেন, এই আশায় যে বসতি স্থাপন বা শান্তি আলোচনা নিয়ে চাপ দিলে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের সমালোচনা করবে।
রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে সমর্থন হ্রাসের কারণ বিশ্বাসের সংঘাতের চেয়ে স্বার্থের ভিন্নতা। ইউক্রেনকে সমর্থন করতে করদাতাদের অর্থ ব্যবহার নিয়ে যে ক্ষোভ তা ইসরায়েলের দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে।
ইসরায়েলের কাতার ও সিরিয়ায় হামলা ট্রাম্পের আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে দুর্বল করেছে। কিছু ধনী দাতা, যারা অর্থকে প্রাধান্য দেওয়া প্রেসিডেন্টের দ্বারা প্রভাবিত, তারা উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
গাজায় যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। যখন আমেরিকানরা অনাহারী শিশুদের ছবি দেখে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই আঁতকে ওঠে। রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন মনে করেন, ইসরায়েল ইরান আক্রমণ করে আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধে টেনে আনতে পারে। ইসরায়েলের যখনই সমালোচনা করা হয়, তার সমর্থকরা তখনই ইহুদিবিদ্বেষ বলে অভিযোগ এনে পাল্টা আক্রমণ করেন, যা সবসময় ন্যায্যতা হারায। এই মারাত্মক অভিযোগের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এর ধার কমে যাচ্ছে। যা ইসরায়েলসহ বিশ্বের সব ইহুদিদের জন্য কল্যাণকর কিছু না।
ইসরায়েলপন্থি আশাবাদীরা একে শুধু ভয় দেখানো বলে মনে করতে পারেন। তাদের মতে, অতীতেও ইসরায়েলি ও আমেরিকান সরকারগুলোর মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে। গাজা যুদ্ধ শেষ হলে এবং নতুন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এলে আমেরিকার কাছাকাছি থাকার স্বার্থ আবার জোরদার হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ক্ষমতা বৃদ্ধি মানে আমেরিকার পক্ষে দেশটিকে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।
কিন্তু এই ধারণা আত্মতুষ্টিমূলক। সরকারের মধ্যেকার বিরোধের চেয়ে জনমতের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন অনেক বেশি বিপজ্জনক। জনমত ধীরে ধীরে গতি পেলেও তা পরিবর্তন করা কঠিন। ভোটাররা একবার মত পরিবর্তন করলে রাজনৈতিক বিধিনিষেধ হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে। অনেক ইসরায়েলি বিশ্লেষক আশঙ্কা করেন যে, জো বাইডেন-ই শেষ জায়নবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
সামরিক সমর্থন একটি কয়েক দশকব্যাপী চুক্তি দ্বারা সুরক্ষিত। বর্তমান চুক্তিতে ইসরায়েলকে বছরে ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করে। এই চুক্তি ২০২৮ সালে শেষ হবে এবং এর মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আলোচনা হবে। কিন্তু ইসরায়েল চিন্তিত যে ট্রাম্প অর্থ দিতে অস্বীকার করতে পারেন এবং চুক্তিটিকে একটি অংশীদারত্ব হিসেবে পুনরায় সামনে আনার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ইসরায়েলের জন্য এই অর্থ ভাগাভাগি করার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রযুক্তি বিনিময় এবং যুদ্ধের সময় উন্নত ও আধুনিক অস্ত্রের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
নেতানিয়াহুর কোনও উত্তরসূরি সব ঠিক করে দিতে পারবেন বলে ধরে নেওয়া ভুল। ইসরায়েলও একটি বিভক্ত গণতন্ত্র, যেখানে অনেক ভোটার জাতীয়তাবাদী-ধর্মীয় ডানপন্থিদের সমর্থন করে। যুদ্ধ বন্ধ হলেও গাজা একটি চলমান ক্ষত হিসেবে থাকবে। শক্তিশালী দলগুলো বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের কিছু অংশ দখল করার জন্য বদ্ধপরিকর।
নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইসরায়েলকে একটি ‘সুপার-স্পার্টা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যে দেশ একা দাঁড়াতে প্রস্তুত। গাজায় লড়াই চালিয়ে এবং ইচ্ছামতো আরব রাজধানীগুলোতে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল বাজি ধরছে যে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আধিপত্য এটিকে আরও সুরক্ষিত করবে। এই ‘পেশিশক্তি-নির্ভর’, স্বাবলম্বী হওয়ার ভাবনা একটি দুঃখজনক ভুল ধারণা।
এটি শেষ পর্যন্ত তার অমূল্য রক্ষক যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। ইসরায়েলের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক কৌশলগত ভুল আর হতে পারে না।
দ্য ইকনোমিস্ট অবলম্বনে।