যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া শান্তি প্রস্তাবে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনের সেনাদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে প্রতিবাদ, ক্ষোভ আর ক্লান্তির মিশ্র সুর। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইমেইলে অর্ধ ডজনের বেশি সেনা তাদের মত জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে প্রস্তাবের বিশদ ফাঁস হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের আলোচকরা প্রস্তাবটির সংশোধনী নিয়ে কাজ করছেন।
মূল প্রস্তাবকে পূর্ব ইউক্রেনের সেনা ইয়ারোস্লাভ ‘হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘এটা কেউ মেনে নেবে না।’ একজন সামরিক চিকিৎসক এটিকে ‘অবমাননাকর ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে উড়িয়ে দেন। তবে স্ন্যাক নামের এক সেনা মনে করেন, অন্তত কোনও কিছু নিয়ে তো একমত হওয়া দরকার।
রাশিয়ার অগ্রগতির সময়ে মার্কিন প্রস্তাবটি এলো। গত এক মাসেই ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা হারিয়েছে ইউক্রেন। ডনবাসের মাত্র ১৫ শতাংশ এখনও নিয়ন্ত্রণে থাকলেও খসড়া প্রস্তাবে পুরো লুহানস্ক ও ডনেস্ক অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব এলাকা ইউক্রেন চার বছর ধরে নিজেদের প্রতিরক্ষায় রাখতে পেরেছে।
স্ন্যাক বলেন, ওগুলো ছেড়ে দেওয়া হোক। শহর-গ্রামে কেউ নেই প্রায়। আমরা মানুষ নয়, ভূমির জন্য লড়ছি। আর তাতে মানুষ মরছে।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের কর্মকর্তা আন্দ্রি বলেন, বিষয়টি ‘কষ্টদায়ক’। তবে ‘সামরিক শক্তি ও সম্পদে তা ধরে রাখা সম্ভব নয়।’
২০১৪ সাল থেকে লড়াইরত সেনা মাতরোস মনে করেন, ডনবাস ছেড়ে দিলে ‘সব ব্যর্থ’ হবে এবং ‘শহীদ সেনা ও বেসামরিকদের আত্মত্যাগ অস্বীকার’ করা হবে।
মার্কিন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৬ লাখে নামিয়ে আনতে হবে। যা বর্তমানে ৮ লাখের বেশি। স্ন্যাক মনে করেন, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে এসব সদস্যের প্রয়োজন হবে। আন্দ্রি বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থাকলে এত বড় বাহিনী রাখার প্রয়োজন নেই, অর্থনীতিও তা বহন করবে না।
তবে সামরিক চিকিৎসক বলেন, সেনাবাহিনীই ‘পরাজয় ও দাসত্ব থেকে রক্ষার একমাত্র ঢাল’। মাতরোসও এ প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব ও কৌশলী’ বলে অভিহিত করেন।
প্রস্তাবে ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ বাদ থাকলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পথ খোলা রাখা হয়েছে। রাশিয়া আবার আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে। তবে কীভাবে তা হবে, বিস্তারিত নেই। ন্যাটো বাহিনী ইউক্রেনে থাকবে না বলেও উল্লেখ আছে।
ড্রোন অপারেটর ইয়েভহেন মনে করেন, মিত্র বাহিনীর উপস্থিতি জরুরি। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং গঠনের প্রচেষ্টাকে তিনি সমর্থন করেন।
কিন্তু আন্দ্রি বলেন, ইউরোপ দুর্বল ও বিভক্ত। আশা রাখতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই। অন্যদিকে সামরিক চিকিৎসক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা গ্যারান্টি নয়।
যুদ্ধ-পরবর্তী ১০০ দিনের মধ্যে ইউক্রেনে নতুন নির্বাচনের বিষয়টিও মার্কিন প্রস্তাবের অংশ। যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন সংবিধানবিরোধী। তবে দুর্নীতির অভিযোগে বর্তমান সরকারের প্রতি ক্ষোভ বেড়েছে। জ্বালানি খাতে ১০ কোটি ডলারের দুর্নীতি তদন্ত করছে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা নাবু। অভিযোগে দুই মন্ত্রী বরখাস্ত হয়েছেন। তদন্তে রয়েছেন সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও এক ব্যবসায়ীও।
ফ্রন্টলাইনে থাকা সেনাদের মধ্যেও নির্বাচনের পক্ষে মত রয়েছে। স্ন্যাক বলেন, ‘এগুলো দরকার, বর্তমান সরকার বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মারিন ও আন্দ্রিও দুর্নীতিমুক্ত ‘পুনর্গঠন’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। যদিও আন্দ্রি মনে করেন, তা তাৎক্ষণিক হওয়া উচিত নয়।
অনেক সেনা মনে করেন, প্রস্তাব কার্যকর হবে না। ইয়ারোস্লাভ বলেন, এটি হবে না। ওলেক্সান্দর নামে এক সেনা এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে যুদ্ধক্লান্তির সুরও স্পষ্ট। আপত্তি থাকলেও আন্দ্রি বলেন, যদি এটি যুদ্ধ থামায়, তাহলে আমার কাছে সেটাই কার্যকর।