প্রতি বছর শুধু নতুন চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আসর নয়, বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রে অস্কারের আগাম সংকেত হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (টিআইএফএফ)। প্রতিবছর দর্শক নির্বাচিত পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ড সেই কারণেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে।
এবারের ৫০তম আসরে ইতিহাস তৈরি করলেন চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিনি নির্মাতা ক্লোয়ে ঝাও। তার নতুন ছবি ‘হ্যামনেট’ শুধু দর্শক হৃদয় জয় করেনি, বরং ঝাওকে টিআইএফএফ ইতিহাসের প্রথম নির্মাতা হিসেবে দ্বিতীয়বার পিপল’স চয়েস জেতার সম্মান এনে দিলো।
অস্কারের পথে ‘হ্যামনেট’
পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে, টিআইএফএফ-এর পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ড অনেক সময় অস্কারের ‘সেরা ছবি’র প্রতিযোগিতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়। গত ১৫ বছরে এই পুরস্কারজয়ী ১২টি চলচ্চিত্র অস্কারের মনোনয়ন পেয়েছে, আর ৪টি শেষ পর্যন্ত সেরা ছবির স্বীকৃতি ঘরে তুলেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে ঝাওয়ের ‘নোম্যাডল্যান্ড’ (২০২০) সেই তালিকায় রয়েছে। তাই এবারের ‘হ্যামনেট’ জয় নিঃসন্দেহে ঝাওকে আবারও অস্কারের দৌড়ে এগিয়ে রাখবে।
বলা দরকার, ‘হ্যামনেট’-এর ঠিক পেছনে ছিল গিলারমো দেল তোরোর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ এবং রায়ান জনসনের ‘ওয়েক আপ ডেড ম্যান’। এ দুই ছবিও আলোচনায় ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দর্শক ভোটে এগিয়ে গেলেন ঝাও। এ প্রতিযোগিতা প্রমাণ করে টিআইএফএফ এখন এমন এক মঞ্চ, যেখানে শিল্প ও বাণিজ্যিক উভয় ধারা একসাথে মূল্যায়িত হয়।
নতুন পুরস্কারের সূচনা
এবারের উৎসবে যুক্ত হয়েছে দুটি নতুন বিভাগ—আন্তর্জাতিক পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ড এবং সেরা অ্যানিমেটেড স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। পার্ক চান-উকের ‘নো আদার চয়েস’ আন্তর্জাতিক বিভাগে সেরা হয়েছে, যা প্রমাণ করে এশিয়ান সিনেমার শক্তিশালী উপস্থিতি এখন টিআইএফএফ-এর বড় আকর্ষণ। অন্যদিকে অ্যানিমেটেড বিভাগে জিতেছে অ্যাগনেস প্যাট্রনের ‘টু দ্য উডস’, যা ইউরোপীয় অ্যানিমেশনের নান্দনিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেছে।
কানাডিয়ান সিনেমার উত্থান
স্থানীয় চলচ্চিত্রের জন্য বরাদ্দ বিভাগেও সাফল্য এসেছে এবার। ‘রং হাজব্যান্ড’ (জাকারিয়াস কুনুক) সেরা কানাডিয়ান ফিচার ফিল্ম, আর ‘ব্লু হেরন’ (সোফি রোমভারি) সেরা কানাডিয়ান ডিসকভারি। এসব অর্জন কানাডিয়ান সিনেমার আঞ্চলিক গল্পকে বৈশ্বিক আলোচনায় নিয়ে যাচ্ছে।
বলা ভালো, কান, ভেনিস বা বার্লিনের মতো উৎসবের শিল্পধর্মী কঠোরতার বদলে টরন্টো বরাবরই দর্শকপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দেয়। এ উৎসবে দর্শকভোটের প্রভাবই আসল শক্তি। ফলে, টিআইএফএফ মূলত একধরনের ‘অস্কার পরীক্ষাগার’, যেখানে হলিউডের বড় স্টুডিও থেকে শুরু করে স্বাধীন প্রযোজক—সবার জন্যই ছবির বাজার যাচাইয়ের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়।
২০২৫ সালের টিআইএফএফ প্রমাণ করলো, সিনেমা এখনও দর্শকের হাতেই সবচেয়ে বেশি নির্ধারিত। ক্লোয়ে ঝাওয়ের ‘হ্যামনেট’ সেই দর্শকপ্রেমের শক্তিকে ধারণ করেই এগিয়ে যাচ্ছে অস্কারের পথে। তবে এ দৌড়ে দেল তোরো, জনসন কিংবা পার্ক চান-উকের মতো নির্মাতারাও যে পিছিয়ে নেই, সেটাও স্পষ্ট হলো। শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে যাবে—তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা শুধু অস্কার মঞ্চের।
৪ সেপ্টেম্বর কানাডার টরন্টো শহরে পর্দা ওঠে ৫০তম টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল-এর পর্দা। যা নামে আজ ১৪ সেপ্টেম্বর। প্রায় দুই সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী, প্রিমিয়ার, রেড কার্পেট, পার্টি আর জমজমাট আয়োজন শেষে টরন্টোর রবিবার সকালে টিআইএফএফ-এর পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68c703bbd6e43" ) );
এক নজরে প্রধান পুরস্কারগুলো:
পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ড: হ্যামনেট (ক্লোয়ে ঝাও)প্রথম রানার-আপ: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন (গিলারমো দেল তোরো)দ্বিতীয় রানার-আপ: ওয়েক আপ ডেড ম্যান (রায়ান জনসন)
পিপল’স চয়েস ডকুমেন্টারি অ্যাওয়ার্ড: দ্য রোড বিটুইন আস: দ্য আলটিমেট রেসকিউ (ব্যারি অ্যাভরিচ)প্রথম রানার-আপ: ইপিক: এলভিস প্রিসলি ইন কনসার্ট (বাজ লুহরম্যান)দ্বিতীয় রানার-আপ: ইউ হ্যাড টু বি দেয়ার: হাউ দ্য টরন্টো গডস্পেল ইগনাইটেড দ্য কমেডি রেভল্যুশন (নিক ডেভিস)
পিপল’স চয়েস মিডনাইট ম্যাডনেস অ্যাওয়ার্ড: নিরভানা দ্য ব্যান্ড দ্য শো দ্য মুভি (ম্যাট জনসন)প্রথম রানার-আপ: অবসেশন (কারি বার্কার)দ্বিতীয় রানার-আপ: দ্য ফিউরিয়াস (কেনজি তানিগাকি)
আন্তর্জাতিক পিপল’স চয়েস অ্যাওয়ার্ড: নো আদার চয়েস (পার্ক চান-উক)প্রথম রানার-আপ: সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু (ইওয়াকিম ট্রিয়ার)দ্বিতীয় রানার-আপ: হোমবাউন্ড (নীরাজ ঘাইওয়ান)
প্ল্যাটফর্ম প্রাইজ: টু দ্য ভিক্টরি! (ভ্যালেন্টিন ভাসিয়ানোভিচ)সম্মাননা: হেন (গিয়রগি পালফি)
সেরা কানাডিয়ান ফিচার ফিল্ম: রং হাজব্যান্ড (জাকারিয়াস কুনুক)সম্মাননা: দেয়ার আর নো ওয়ার্ডস (মিন সুক লি)
বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড: ব্লু হেরন (সোফি রোমভারি)সম্মাননা: ১০০ সানসেট (কুনসাং কিরিয়ং)
শর্ট কাটস– সেরা আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: টক মি (জোকার হানা)সম্মাননা: আগাপিতো (আর্বিন বেলারমিনো, কাইলা ডানেল রোমেরো)
শর্ট কাটস– সেরা কানাডিয়ান স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: দ্য গার্ল হু ক্রাইড পার্লস (ক্রিস লাভিস, মাচিয়েক স্জেচেরবভস্কি)সম্মাননা: এ সফট টাচ (হিদার ইয়ং)
শর্ট কাটস– সেরা অ্যানিমেটেড স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র: টু দ্য উডস (অ্যাগনেস প্যাট্রন)
ভিমিও স্টাফ পিক: আই ফিয়ার ব্লু স্কাইস (সালার পশতুনিয়ার)
নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড: ইন সার্চ অব দ্য স্কাই (জিতঙ্ক সিংহ গুর্জার)
ফিপ্রেসকি আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার (উদীয়মান নির্মাতাদের জন্য): ফোরাস্তেরা (লুসিয়া আলেনার ইগলেসিয়াস)