আব্বাকে কদমবুসি করে চেক–ইনের জন্য ঢুকতে যাচ্ছিলাম, তখনই কেঁদে উঠল আরিয়া

আব্বাকে কদমবুসি করে চেক–ইনের জন্য ঢুকতে যাচ্ছিলাম, তখনই কেঁদে উঠল আরিয়া

আসার সময় কাউকে জানাতেই পারিনি। তাই পরিবারের কয়েকজন শুধু বিদায় দিতে বিমানবন্দরে এল। তখনো ফুরফুরে মেজাজে আমার কন্যা আরিয়া রাজেশ্বরী। তার অবশ্য ঘর থেকে বের হলেই আনন্দ। রাতের বেলা, শহরের এখানে-সেখানে লাইট জ্বলছে—আরিয়ার আনন্দ দেখে কে! বিমানবন্দরের লবিতে সে লাফালাফি করল। কতক্ষণ আমার হাত ধরে হাঁটল। এর পরও আমার আঙুলটা শক্ত করে ধরে রাখল—যেন আঙুল ছাড়লেই পাপা হারিয়ে যাবে। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটার কাছে মিনতি করি, আরেকটু ধীরে চলো, একটু সময় দাও।

আব্বাকে কদমবুসি করার পর বুঝলাম, সময় শেষ। দ্রুত চেক–ইনের জন্য ঢুকতে যাচ্ছিলাম। তখনই আরিয়া কেঁদে উঠল। এতক্ষণে মেয়ে বুঝতে পেরেছে, পাপা চলে যাচ্ছে। আবার কবে পাপার কোলে উঠবে, আবার কবে নোজ-হাগ হবে, আবার কবে পাপা জড়িয়ে ধরে তাকে নিয়ে হাঁটবে, সেগুলো বোঝার মতো বয়স তার হয়নি। তাই সবাই তাকে বোঝাচ্ছে, পাপা অফিসে যাচ্ছে, একটু পর ফিরে আসবে।

সবাইকে ছেড়ে বিমানবন্দরের ভেতরে গিয়ে কর্মকর্তাদের বোর্ডিং পাস দেখালাম। সঙ্গে নেওয়া বড় লাগেজগুলো ওজন মাপার জন্য তুলে দিলাম। তারপর এক কর্মকর্তাকে অনুরোধ করলাম, আমি কি দুই মিনিটের জন্য আবার দরজায় ফিরে যেতে পারি? জানি না, আমার চোখে কী আকুতি তাঁরা দেখেছিলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে। দ্রুত চলে আসবেন প্লিজ।’

আবার দরজায় ফিরলাম। আব্বা, আমার স্ত্রী, শ্বশুর, আমার ভাই–বোনেরা সবাই আতঙ্ক নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমাকে কি ফেরত পাঠাল?

ইশারায় বোঝালাম, কোনো সমস্যা হয়নি।

দরজায় এসে মোটা গ্লাসের এক পাশে হাত রাখলাম, অন্য পাশে আরিয়া হাত রাখল। সে হাত আর ছোঁয়া গেল না। আরিয়া পাপার কাছে যাবে বলে কাঁদছে; কিন্তু কেন যেন আমি কাঁদতে পারছি না। আমি যেন একটি জড়বস্তু হয়ে গেছি। রোবটের মতো হ্যান্ড লাগেজটা নিয়ে আবার নতুন জীবনের যাত্রা শুরু করলাম। নিজেকে যেন বলছি, ‘মনমাঝি খবরদার, তোমার তরি যেন ভেড়ে না, তোমার নৌকা যেন ডোবে না।’

৭ আগস্ট এভাবেই আমেরিকায় আসি। এই দেশে এক মাস পূর্ণ হলো। গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের তিনটি কোর্সে কাজ করছি। ছাত্রদের ক্লাস নেওয়া, নিজের ক্লাসে যাওয়া, অধ্যাপকদের সঙ্গে গবেষণায় অংশ নেওয়া, এসব দারুণ অভিজ্ঞতা হচ্ছে। তবে দিন শেষে ঘরে ফিরলে মন পড়ে থাকে বাড়িতে, মেয়ের কাছে।

সেই সঙ্গে দেশ ছাড়ার কষ্ট দিন দিন বাড়ছে। বন্ধু ও আত্মীয়স্বজন কাউকে ‘বিদায়’ বলে আসতে পারিনি। কে জানে কত কত মানুষের সঙ্গে জীবনের শেষ দেখা হয়ে গেছে। কতজনকে যে বুকে জড়িয়ে ধরে ‘ভালো থেকো’ বলতে পারিনি, তার কি হিসাব আছে? এমনকি বাংলাদেশ ছাড়ার দিনে ভালোমতো কাঁদতেও পারিনি। সেই কান্না আমার এক মাস পর আসছে, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো গর্জন করে করে কান্না পাচ্ছে।

ভালো থেকো বাংলাদেশ, আবার দেখা হবে।

ফয়সাল খলিলুর রহমান: গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট, টেক্সাস আ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin