রাজধানীতে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে উঠে এসেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই শুটারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্বেই মামুন হত্যাকাণ্ড।
প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মামুন, রনি ও ইমন একসময় একই গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তবে প্রভাব, এলাকা দখল ও অর্থবিত্তের লড়াই থেকেই মামুনকে হত্যা করা হয়।
বুধবার (১২ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টোরোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনায় ছিল সন্ত্রাসী রবি। তাকে গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার করা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, মামুন, রনি ও ইমন একসময় একই আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কে কাজ করত। পরে গ্রুপ ভেঙে গেলে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত খুনে রূপ নেয়।”
তিনি আরও বলেন, “এটা আমরা তদন্তের মাধ্যমেই প্রমাণ করতে চাইছি—কে কার সঙ্গে জড়িত ছিল, কে পরিকল্পনা দিয়েছে, আর কে কেবল টাকা দিয়েছে। রনির গ্রেফতার হলে এই হত্যার নেপথ্য কারিগরদের পুরোটা উন্মোচন হবে।”
দীর্ঘ ২৪ বছর কারাভোগের পর ২০২৩ সালে জামিনে মুক্ত হন তারিক সাইফ মামুন। জেল থেকে বের হয়েই তিনি পুরোনো প্রভাব ফিরে পেতে চেষ্টায় নামেন বলে উল্লেখ করেন শফিকুল ইমলাম।
তিনি বলেন, "আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিয়মটা এমন—একজন জেলে গেলে আরেকজন সেই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। মামুন যখন জেলে ছিলেন, তখন অন্যরা তার প্রভাব এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। মামুন বেরিয়ে এসে তার পুরোনো সাম্রাজ্য ফিরে পেতে চাচ্ছিল। সেখান থেকেই নতুন করে দ্বন্দ্ব শুরু। প্রভাব, চাঁদাবাজি, দখল ও প্রভাববলয়—সবকিছু নিয়েই ছিল এদের বিরোধ। রনি ও ইমন তখন মাঠে ছিল, মামুন ফিরে এসে সেটি দখল নিতে চাইছিলেন। এই দখলযুদ্ধই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
তিনি বলেন, “গত ১০ নভেম্বর সকালে মামুন হত্যাকাণ্ডের পরপরই আমরা তদন্ত শুরু করি। ২৬ ঘণ্টার টানা অভিযানে সিলেট, নরসিংদী ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে দুই শুটারসহ জড়িত পাঁচজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, রবিন, ফারুক, রুবেল, ইউসুফ ও শামিম। এসময় তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি পিস্তল, ছয় রাউন্ড গুলি ও নগদ এক লাখ ৫৩ হাজার ৬৪০ টাকা উদ্ধার করা হয়।”
মামুন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনা রনির ছিল উল্লেখ করে অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “রনির নির্দেশে স্যুটার রবিন ও ফারুককে কন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়। এজন্য তাদের দুইজনকে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। দুই লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনাকারীরা শুটারদের পেমেন্টও দিয়েছে।”
এ হত্যাকাণ্ডের জোসেফ, পিচ্চি হেলালসহ আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীও জড়িত কিনা, সাংবাকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা ধারণা করছি, এদের কেউ কেউ সরাসরি পরিকল্পনাকারী হিসেবে যুক্ত থাকতে পারে। তারা কোথায় আছে, কাদের আশ্রয়ে লুকিয়ে আছে—এসব তথ্য আমরা যাচাই করছি। প্রয়োজনে ইন্টারপোল ও সীমান্ত গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তাও নেওয়া হবে। তবে মামুন হত্যায় মূল পরিকল্পনাকারী রনি এখনও পলাতক। এই হত্যাকাণ্ডে রনি ছিল কেন্দ্রীয় চরিত্রে। আমরা নিশ্চিত, রনিকে গ্রেফতার করা গেলে কারা এই পরিকল্পনা সাজিয়েছে, কারা অর্থ দিয়েছে—সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ডিবি দক্ষিণ) মো. নাসিরুল ইসলাম, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ডিবি উত্তর) মো. রবিউল হোসেন ভুইয়া, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ডিবি সাইবার সিকিউরিটি এন্ড সাপোর্ট সেন্টার) সৈয়দ হারুন আর রশিদ, ডিবি লালবাগ বিভাগের উপ- পুলিশ কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার ও ডিএমপি মিডিয়া শাখার ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।