২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। জাতিসংঘ ১৯৮১ সালে এ দিবসের সূচনা করেছিল বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরতি ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে। উদ্দেশ্য ছিল এক সময় অস্ত্র থেমে যাবে, সংঘাতপীড়িত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো যাবে, মানুষ বুঝতে পারবে শান্তির প্রকৃত সৌন্দর্য। কিন্তু বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, চার দশক পরে আমরা কি সত্যিই শান্তির কাছাকাছি এসেছি? নাকি যুদ্ধ, সহিংসতা আর বিভাজনের আরও গভীরে ডুবে গেছি?
প্রকৃত অর্থে, শান্তি কেবল অস্ত্রবিরতি বা যুদ্ধহীনতার নাম নয়, বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক জীবনের অঙ্গীকার। শান্তি এমন এক মূল্যবোধ, যা মানুষের মৌলিক অধিকার, সমতা, সহনশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। মানবাধিকারের মৌলিক নিশ্চয়তা ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা কখনই সম্ভব নয়। একটি সমাজে যদি নারীরা নির্যাতন বা সহিংসতার ভয়ে ঘর থেকে বের হতে না পারে, যদি শিশুরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার হয়, তাহলে সেখানে প্রকৃত শান্তি বিদ্যমান থাকে না।
শান্তি তখনই বাস্তব রূপ লাভ করে, যখন প্রতিটি মানুষ নিরাপত্তা অনুভব করে, মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার ভোগ করে এবং ভয়হীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে।
অন্যদিকে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও বেকারত্ব শান্তির আরেকটি বড় অন্তরায়। যুদ্ধবিহীন সমাজেও এ সমস্যাগুলো নীরব সহিংসতার রূপ নেয়। যখন মানুষ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন শান্তি কেবল মুখের কথা হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা দীর্ঘমেয়াদে অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি করে, যা শান্তিকে দুর্বল করে তোলে।
আমরা লক্ষ করছি আজকে সারা পৃথিবীর একটি উল্লেখযোগ্য অঞ্চল অশান্তির আগুনে পুড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া বহু সময় ধরে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত; লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে দেশান্তরী হয়েছে। ইয়েমেনে প্রতিদিন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে খাদ্যাভাব ও বোমার আঘাতে।
ফিলিস্তিনে প্রতিনিয়ত জীবন বিধ্বংসী হামলা চলমান। আফ্রিকার সুদান কিংবা সাহেল অঞ্চলে রক্তপাত থামাতে পারছে না কেউ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিপর্যস্ত করেছে। আমাদের একেবারে প্রতিবেশী মিয়ানমারে সামরিক জান্তার দমননীতি চলছে নির্দয়ভাবে, যার প্রতিক্রিয়া আমরা বহন করছি রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটের মাধ্যমে।
বস্তুত, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো যুদ্ধ অর্থনীতি। বৈশ্বিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো শান্তির কথা বলে, আবার একই সঙ্গে অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রিতে প্রতিযোগিতা চালায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র ব্যবসায়ী বলা চলে। ফলে শান্তির প্রশ্ন বারবার তাদের কৌশলগত স্বার্থে বন্দি হয়ে পড়ে বলে ধারণা করা যায়। এমনকি ভেটো ক্ষমতার বলে তারা মানবিকতার চেয়ে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে অনেক সময়ে বড় করে দেখে বলে মনে হয়। এভাবে বৈশ্বিক রাজনীতি শান্তিকে উপেক্ষা করে চলে গেছে এক অদৃশ্য বাজার অর্থনীতির কাছে।
অপরদিকে শান্তির পথে বাধা শুধু যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশে দেশে রাষ্ট্রীয় দমননীতি, নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে এক ধরনের ভীতি ও অসন্তোষ তৈরি করে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠরোধ করা হলে শান্তির পরিবেশ ভেঙে পড়ে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাই কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, দরকার সেই আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নাগরিকদের ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়া।
যদিও বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয় দেশ, তারপরও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতমুখর। বিগত সরকারের সময়ে বিরোধী মত দমনে কঠোরতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতনের অভিযোগ ছিল উল্লেখ করার মতো। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের সময়ে গুমের মতো নিষ্ঠুর ঘটনার অভিযোগ এখনও শোনা যায়নি। তবে মব সন্ত্রাস-এর নামে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করেছে। বিনা বিচারে বা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হত্যার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় শান্তি প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ দেশে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতিও সবসময় আশাব্যঞ্জক ছিল না। নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা কিংবা মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির মতো ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শান্তি মানে শুধু যুদ্ধহীনতা নয়; শান্তি মানে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা।
অন্যদিকে সীমান্ত ও শরণার্থী সংকট আমাদের শান্তিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিয়মিত হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন সত্ত্বেও একই ঘটনা ঘটে চলছে। পাশাপাশি, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর স্রোত আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে নড়বড়ে করছে। কক্সবাজারে লাখ লাখ আশ্রিত রোহিঙ্গার দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি আমাদেরকে সংকটে ফেলেছে। এর ফলে অপরাধপ্রবণতা ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে, যা সামগ্রিক শান্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অবশ্য, এসবের পাশাপাশি আমাদের ইতিবাচক দিক রয়েছে উল্লেখ করার মতো। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য-যেখানেই শান্তিরক্ষার প্রয়োজন পড়েছে, বাংলাদেশের সৈন্যরা সেখানে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা শান্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রকৃত পক্ষে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবি, শ্রমজীবী, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং তরুণ প্রজন্ম সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শান্তি আসবে না। প্রতিটি স্তরে আমাদের জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আমাদের প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে তরুণ প্রজন্মকে সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রকে মানবাধিকারের প্রশ্নে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী