চীনের নেতৃত্বাধীন অক্ষের পরবর্তী লক্ষ্য কি জাপান?

চীনের নেতৃত্বাধীন অক্ষের পরবর্তী লক্ষ্য কি জাপান?

বহুমেরু বিশ্বের প্রেক্ষাপটে চীনের নেতৃত্বে গঠিত নতুন অক্ষ চীন, রাশিয়া ও ভারতের একত্রে উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলন এবং বেইজিংয়ের কুচকাওয়াজে শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও কিম জং-উনের একত্রিত হওয়া অনেকেই এক নতুন বৈশ্বিক শক্তি-বিন্যাসের সংকেত হিসেবে দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে: এই অক্ষের পরবর্তী লক্ষ্য কি জাপান?

চীন-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

চীন ও জাপানের দ্বন্দ্ব শতাব্দী প্রাচীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের আগ্রাসন ও চীনে নানজিং গণহত্যার মতো ঘটনার স্মৃতি এখনও চীনা জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করে রেখেছে। যদিও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে, জাপান শান্তিবাদী সংবিধান মেনে চলেছে। তবুও তাদের অর্থনৈতিক শক্তি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় চীন সবসময় জাপানকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। চীনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে জাপানের বিরুদ্ধে প্রতীকী অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে একটি কৌশলগত অস্ত্র। ফলে যখন চীন বহুমেরু বিশ্বের নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন জাপান স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই সামনে আসছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক

জাপান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বড় অংশ জাপানেই অবস্থিত ওকিনাওয়ার ঘাঁটির প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে জাপানের নিরাপত্তা অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। ট্রাম্প হোক বা বাইডেন, উভয় প্রশাসনই জাপানকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব রুখতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। চীনের নেতৃত্বাধীন অক্ষ যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী এক বলয় গঠন করতে চায়, তবে তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অবশ্যই জাপানকে কোণঠাসা করা। কারণ জাপানকে পাশে না রাখলে ওয়াশিংটনের এশিয়া নীতি দুর্বল হবে না।

অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা

জাপান দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি ও শিল্প উৎপাদনে বিশ্বে অগ্রণী। ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর—এসব ক্ষেত্রে টোকিওর অবস্থান শক্তিশালী। চীনও গত দুই দশকে এই খাতগুলোতে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হয়ে উঠেছে। ফলে টেকনোলজিক্যাল সুপ্রিমেসি নিয়ে চীন-জাপানের মধ্যে এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সঙ্গে মিলে “চিপ অ্যালায়েন্স” গড়েছে, যার লক্ষ্য হলো সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমানো। চীনের চোখে এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ। তাই চীনের নেতৃত্বাধীন অক্ষ যদি পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তা সরাসরি জাপানের সঙ্গে এই প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রেই হবে।

নিরাপত্তা ইস্যু ও পূর্ব চীন সাগর সংকট

পূর্ব চীন সাগরের সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে চীন ও জাপানের বিরোধ বহু পুরনো। টোকিও প্রশাসনের দাবি দ্বীপপুঞ্জ তাদের সার্বভৌমত্বের অধীনে, কিন্তু বেইজিংও দাবি জানায় এটি তাদের “ঐতিহাসিক ভূখণ্ড”। এই ইস্যুতে দুই দেশের নৌবাহিনী বহুবার মুখোমুখি হয়েছে। চীনের নেতৃত্বাধীন অক্ষ যদি জাপানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তবে পূর্ব চীন সাগর হবে প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র। এখানেই মিলবে রাশিয়ার সমর্থন— কারণ রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। ফলে মস্কো-টোকিওর সম্পর্কও তিক্ত।

পুতিনের দৃষ্টিকোণ থেকে জাপান

রাশিয়া-জাপান সম্পর্ক কখনই উষ্ণ হয়নি। কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এখনও শান্তিচুক্তি হয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধের পর জাপান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অংশীদার হওয়ায় রাশিয়ার ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ফলে রাশিয়ার নেতৃত্বে চীনকে সঙ্গে নিয়ে জাপানকে ঘিরে ধরার কৌশল এখন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে।

ভারতের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান

অক্ষের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ভারত। কিন্তু ভারতের জন্য জাপান এক বড় মিত্র। “কোয়াড” জোটে ভারত-জাপান একসঙ্গে কাজ করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াও আছে। ফলে চীনের নেতৃত্বাধীন অক্ষ যদি সত্যিই জাপানকে লক্ষ্যবস্তু করে, তবে ভারত কী অবস্থান নেবে সেটি জটিল প্রশ্ন। ভারতের জন্য দ্বিমুখী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে: প্রথমত, অর্থনৈতিক স্বার্থে— চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত স্বার্থে—জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বাধ্যতামূলক। ফলে ভারত সরাসরি জাপানবিরোধী কোনও অক্ষের অংশ হতে চাইবে না। এর ফলে অক্ষের ভবিষ্যতও অনেকাংশে নির্ভর করছে দিল্লির কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর।

জাপানের সামরিক পুনরুত্থান

জাপান দীর্ঘদিন শান্তিবাদী সংবিধান মেনে চললেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াচ্ছে। চীনের সামরিক উত্থান ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি টোকিওকে নতুন সামরিক নীতি নিতে বাধ্য করছে। ফাইটার জেট, মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ও নৌবাহিনী শক্তিশালী করার ঘোষণা ইতোমধ্যেই দিয়েছে জাপান। চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার একত্র অবস্থান জাপানকে আরও বেশি পশ্চিমা জোটের দিকে ঠেলে দেবে। এ অবস্থায় অক্ষ যদি জাপানকে “লক্ষ্য” করে, তবে তা এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তুলবে।

উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা

চীন-রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা জাপানের জন্য বড় হুমকি। কারণ উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বেশিরভাগই জাপানের আকাশসীমার ওপর দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। কিম জং-উন যদি চীন ও রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থন পায়, তবে জাপানের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিকল্প

ওয়াশিংটন জাপানকে শুধু মিত্র হিসেবেই নয়, বরং এশিয়ায় নিজেদের সামরিক উপস্থিতির ঘাঁটি হিসেবেও দেখে। তাই চীন-রাশিয়া অক্ষ যদি জাপানের দিকে চোখ রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত ও কঠোর। মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে সঙ্গে নিয়ে একটি নতুন প্রতিরক্ষা বলয় গঠনের পরিকল্পনা করছে। এর ফলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরে চীন-রাশিয়া অক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে নতুন শীতল যুদ্ধের আবহ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এশিয়ার নতুন শক্তি-বিন্যাস সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। বাংলাদেশ যেমন জাপানের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার (মেট্রোরেল, অবকাঠামো প্রকল্প), তেমনি চীনও দেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী। ফলে দুই শক্তির মধ্যে সংঘাত বাড়লে বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে।

চীনের পরবর্তী টার্গেট কি জাপান?

চীনের নেতৃত্বাধীন অক্ষের প্রাথমিক লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করতে হলে তাদের মিত্র জাপানকে কোণঠাসা করা কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। ফলে বলা যায়, জাপান অক্ষের ভবিষ্যৎ কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো জাপান শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তিই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাছেও একটি বিশ্বাসযোগ্য মিত্র। তাই চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া অক্ষ যদি জাপানকে চাপে ফেলে, তবে তা পুরো অঞ্চলে নতুন শীতল যুদ্ধের সূচনা করবে।

সাম্প্রতিক সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং—এই তিন শক্তিধর নেতাকে একই মঞ্চে বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপচারিতায় দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভারত মার্কিন শুল্কের প্রভাবে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আগ্রহী। তবে চীনের নেতৃত্বে এই অক্ষের পরবর্তী টার্গেট যে জাপান, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পথ সহজ হবে না। কারণ এশিয়ার শক্তি-বিন্যাস এখন এতটাই জটিল যে, প্রতিটি পদক্ষেপই নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। আর এই সমীকরণই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ।

লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin