বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণআন্দোলন সবসময়ই গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এভাবেই জনগণের আন্দোলন একসময় সামরিক শাসক এরশাদকে সরিয়েছে, আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার একনায়কতন্ত্র শাসনের পতন ঘটিয়েছে।ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন এক প্রবণতা সমাজে আলোচনায় এসেছে, বলা হচ্ছে মব ভায়োলেন্স বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা।মানবাধিকার কর্মী, বুদ্ধিজীবী, বিশ্লেষক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু প্রতিনিধি পর্যন্ত এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।শেখ হাসিনার পতনের পেছনে ছিল জনতার শক্তি। এই আন্দোলন কেবল একটি সরকারের পতন নয়, বরং একনায়কতন্ত্র ভেঙে নতুন গণতন্ত্রের পথ খুলে দেয়। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির পরই সমাজে নতুন এক শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। মব ভায়োলেন্স বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা।অনেকে বলছেন, আন্দোলনের পর দেশে সহিংসতা বেড়ে গেছে। অনেক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী মনে করছেন, এই প্রবণতা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।তাদের অনেকেই উদাহরণ দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইল চুরির অভিযোগে এক ভবঘুরকে পিটিয়ে হত্যা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে গণপিটুনিতে হত্যা, কুমিল্লায় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুকে অপমান, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা ও সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীকে লাঞ্ছিত করা। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে বলেছেন, সরকার মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।এখন প্রশ্ন হলো এগুলো সত্যিই কি মব ভায়োলেন্স, নাকি জনতার আন্দোলনকে কলঙ্কিত করার একটি প্রচেষ্টা?ইতিহাস বলে, ক্ষমতাসীনরা সব সময় আন্দোলনকারীদের ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’ বা “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়েছে। এরশাদের সময় যেমন হয়েছিল, হাসিনার সময়ও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে। অথচ সেই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের বিজয় এনেছে।২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসন ছিল ভয়াবহ দমননীতি ও একনায়কতন্ত্রের উদাহরণ। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, মিথ্যা মামলা, বিরোধীদের কারাগারে নিক্ষেপ, ভোট কারচুপি- সে সময়ে এসব যেন কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিল না, সমালোচকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।প্রশ্ন হলো সেই দীর্ঘ সময়ে আজকের এই বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবীরা কোথায় ছিলেন? তারা কি গুম-খুন, দুর্নীতি বা নির্বাচনি কারচুপি নিয়ে সত্যিই লিখেছেন বা প্রতিবাদ করেছেন? ব্যাংক লুট, শেয়ার বাজার ধস, মেগা প্রকল্পের নামে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এসব নিয়ে কয়জন সাহসীভাবে কলম ধরেছেন? অথচ আজ তারা জনতার আন্দোলনকে মব ভায়োলেন্স বলে অভিহিত করতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী।তবু একটি সত্য এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কখনও কখনও জনতার প্রতিরোধ সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তখন নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ঘটনা অবশ্যই দুঃখজনক। কিন্তু এর দায় পুরো আন্দোলনের ওপর চাপানো ন্যায়সঙ্গত নয়।এখনও প্রশ্ন থেকে যায় জনতার ক্ষোভ থামছে না কেন? এর কারণ আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা। জনগণ যখন দেখে ফ্যাসিস্ট শক্তি আবারও মাথাচাড়া দিতে চাইছে, অথচ রাষ্ট্র তা দমনে ব্যর্থ, তখন তারা নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আর কখনও কখনও সেটিকেও বলা হচ্ছে মব ভায়োলেন্স।এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন সবার আগে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অন্তর্বর্তী সরকারকে আইনশৃঙ্খলা দৃঢ় হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জনতাকে নিশ্চিত করতে হবে ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স। রাজনৈতিক দলগুলোকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কোনও আপস নয়। যারা নতুন করে ফ্যাসিস্ট হতে চাইবে, তাদের প্রতিরোধেই জনতা নামবে।সত্য হলো, জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই বারবার দেশের ইতিহাস বদলেছে। তাই এখন প্রয়োজন এটিকে সঠিকভাবে বোঝা, সঠিক পথে পরিচালিত করা। জনগণকে বুঝিয়ে দেওয়া এই দেশ আর কোনোদিন একনায়কতন্ত্রের হাতে যাবে না।অন্যথায়, আন্দোলনের ঢেউ আসবেই। আর প্রতিবারই সেই ঢেউকে কারও না কারও মুখে বলা হবে মব ভায়োলেন্স।”
লেখক: কথাসাহিত্যিক