আপন আলোয় শিল্পী কলিম শরাফী

আপন আলোয় শিল্পী কলিম শরাফী

কলিম শরাফী। জন্ম: ৮ মে, ১৯২৪, মৃত্যু: ২ নভেম্বর ২০১০। উদারতা, দৃঢ়তা আর সংগ্রামের মিশেলে উদাত্ত কণ্ঠের রবীন্দ্র-সুন্দর মুক্তপ্রাণ এক। মাটির কাছাকাছি, বিঘ্ন-বিপদ-দুর্যোগে আর্ত সাধারণ মানুষের কাছাকাছি, নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের কাছাকাছি, এককথায় সর্ব-সাধারণের কাছাকাছিই থেকেছেন সারাজীবন। কোনও আদর্শ-বিচ্যুতি নেই জীবন-ভাবনায়, জীবন-যাপনে। শেকড় ঢাকার সোনারগাঁওয়ের রক্ষণশীল সহজিয়া ধারার পীর বংশ, সেখান থেকে পূর্বপুরুষ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে স্থানান্তরিত হন।

লড়াই-সংগ্রামের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ১৯৪০ সালে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে  কলকাতায় নেতাজি সুভাষ বসুর নেতৃত্বে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পুলিশের হাতে নিগৃহীত হন। স্পর্ধিত আঠারোয় ১৯৪২ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে প্রথম গ্রেফতার ও কারাবাস। কারাগারেই তাঁর পরিচয় ঘটে কারাবন্দী সমবয়সী প্রণব গুহঠাকুরতার সঙ্গে। তার কাছেই প্রথম রবীন্দ্রসংগীত শেখা। আরও বেশি করে শেখার আগ্রহ জন্মানো। রাজনীতি তাঁর পেছন ছাড়েনি, ভর্তি হয়েও বছর না ঘুরতেই ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুল ছেড়ে দেন তিনি রাজনীতির টানে, অর্থকষ্টও ছিল নাকি খানিকটা। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় ভর্তি হতে পারেননি শান্তিনিকেতনেও। স্বদেশের পক্ষে সকল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গণসংগীতশিল্পী ও সংগঠক হিসেবে তাঁর নিবিড় যুক্ততা।

আর পেছন ছাড়েনি তাঁর বাঙালি সত্ত্বা, তাঁর রবীন্দ্র-মানস। তাঁর মননে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতির অস্তিত্বের উজ্জ্বল উচ্চারণ, জাতীয় সংকট ও বিপর্যয়ে রবীন্দ্রনাথ নির্ভরতম আশ্রয়। সেজন্যই আইপিটিএ ছেড়ে বহুরূপী নাট্যদল গঠনে যুক্ততা, দক্ষিণীতে গান শেখা, শেখানো। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কিছুতেই রবীন্দ্র-বিমুখ করা যাবে না বাঙালিকে।  বিশেষ করে তাঁর গান বাঙালির গান হয়ে বেঁচে থাকবে যুগ যুগ প্রতিটি বাঙালির জীবন যাপনের অনুষঙ্গ হয়ে। ছেচল্লিশের দাঙ্গা, সাতচল্লিশের দেশ ভাগ এইসবের মধ্যেই গঙ্গার অনেক জল পদ্মা হয়ে এপার ওপার ভাসিয়ে সাগরে গড়ালেও সাতচল্লিশে কলকাতায় আবার দাঙ্গা। ধর্মের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষকে রাজনীতির খোঁয়াড়ে ডেকে আনাকে তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের মতের মতোই পাপ বলে মনে হলো তাঁর। অবস্থার প্রেক্ষিতে কাজ পাচ্ছিলেন না বলে অর্থকষ্ট মেটাতে পরিবার নিয়ে ১৯৫০ সালে ঢাকায় এলেন। কাজ জুটলো। রাজনীতিতে সংস্কৃতির প্রতিফলন স্পষ্টতর করার আন্দোলনের আর্তি প্রবল থাকায় কাজের পাশাপাশি কত কী-ই না করলেন পূর্ব বাংলার জন্য! সিনেমার জন্য গল্প লেখা, বাংলা সিনেমায় ১ম বারের মতো রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহার ও সে গানে কণ্ঠ দেয়া, সিনেমা পরিচালনা, ডকুফিল্ম তৈরি ও তাতে সঙ্গীত পরিচালনা,  থিয়েটারে ১ম বারের মতো সম্ভ্রান্ত ঘরের কন্যা ও নারীদের অভিনয়ে আনা, তখনকার খ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের করাচী নিয়ে গিয়ে গান রেকর্ড করানো, ঢাকায় টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে অনুষ্ঠান পরিচালক হিসেবে বেশী বেশী রবীন্দ্রসংগীত প্রচার আরও কতো কী!

গণসংগীত গেয়ে নিগৃহীত হয়েছেন, রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া ও প্রচার-প্রসারে কাজ করতেন বলে সরকারের রোষানলে পড়েছেন; চাকুরী গেছে, ঢাকা ছেড়ে অন্তরালে থেকেছেন, আবার ঢাকায় ফিরেছেন, তবু লড়াই জারি রেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লন্ডনে আর আমেরিকায় ছিলেন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সভা-সমাবেশ আয়োজনে সংগঠক হিসেবে কাজ যেমন করেছেন, শিল্পী হিসেবে গান গেয়েও প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। উদীচীর উপদেষ্টা ও পরে সভাপতি ছিলেন টানা অনেকদিন। রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার প্রসারে ১৯৭৯ সালে গঠিত ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন তিনি, যা পরবর্তীতে ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৮৩-তে শান্তিনিকেতন প্রত্যাগত শিক্ষকদের নিয়ে ‘সংগীত ভবন’ তৈরি করে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৮ সালে তাঁকেই সভাপতি করে গঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা’, যা আজও রবীন্দ্রনাথ, তাঁর সৃষ্টি এবং বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার প্রসারে ও শিল্পী কল্যাণে নিয়োজিত থেকে দেশের সংস্কৃতি বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণে তাঁর অবদান অসীম। অথচ তাঁর গভীর চলা গোপনই রয়ে গেল বলে মনে হয় এখনও। যদিও পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার। তবু, ততোটা কি আলো বলে মানা হলো তাঁকে, না কি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেন শুধু? সে প্রশ্ন থেকেই যায়। শুধু গান গেয়েই ভুবন ভরিয়ে দিতে পারতেন তিনি, তাঁর সমকক্ষ আজ পর্যন্তও খুব কম পাওয়া যাবে বলে মানি।

আজ এই মহৎ প্রাণের ১৫তম প্রয়াণ দিবসে ‘বাংলাদেশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা’ এবং তাঁর সহযোদ্ধা হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর স্মৃতি ও কর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তাঁকে স্মরণ করছি অপার ভালোবাসায়, তাঁর কাছে ঋণ স্বীকার করছি দ্বিধাহীন।

লেখক: সংগীতশিল্পী

Comments

0 total

Be the first to comment.

এক টিকিটে তিন নাটক! BanglaTribune | বিনোদন

এক টিকিটে তিন নাটক!

নাট্যপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য সন্ধ্যা অপেক্ষা করছে! চারুনীড়ম থিয়েটার উদযাপন করতে যাচ্ছে তাদের ১০০তম ম...

Sep 13, 2025

More from this User

View all posts by admin