বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক উন্নয়নের পথে আছে। রফতানি, শিল্প, প্রযুক্তি এবং সেবা খাত ক্রমেই বড় হচ্ছে। এই উন্নয়নের ধারাকে ধরে রাখতে হলে কেবল নতুন শিল্প স্থাপন করা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ব্যবসায়িক পরিবেশকে বিনিয়োগবান্ধব ও কার্যকর করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, দেশের শিল্প ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে মামলা হয়রানি এবং প্রশাসনিক জটিলতা। উদ্যোক্তারা শুধু আর্থিক ঝুঁকির মুখোমুখি নন, বরং আইনগত ও প্রশাসনিক ঝুঁকিতেও পড়ছেন। সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। দেশে বড় মেগা প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে একটি গণমাধ্যমসূত্রে জানতে পারলাম যে ছয়টি বড় প্রকল্পের বিলম্বের কারণে আনুমানিক এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। মেট্রোরেল, সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল- সব ক্ষেত্রে দেখা গেছে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, উপকরণ সরবরাহে বিলম্ব, ডিজাইন পরিবর্তন, দক্ষ জনবল অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাধাগ্রস্ত করছে। এই ধীরগতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমাচ্ছে।বেসরকারি খাতেও একই চিত্র লক্ষ করা যায়। উদ্যোক্তারা লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন এবং কর সংক্রান্ত কাজে বারবার সরকারি দফতরের দ্বারস্থ হন। আমদানি ও রফতানির ক্ষেত্রে ল্যাব টেস্ট, সার্টিফিকেশন এবং যন্ত্রপাতি অনুমোদনের জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ধীর, শুল্ক ও কর নীতি অস্থির। এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যবসায় ঝুঁকি এখন শুধু আর্থিক নয়, আইনগত ও প্রশাসনিক ঝুঁকি অনেক বেশি।উন্নত রাষ্ট্রগুলো এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক সালিশ কেন্দ্র প্রতি বছর শতাধিক বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত সমাধান করে। ২০২৪ সালে এখানে নতুন ৬২৫টি মামলা এসেছে, যার ৯১ শতাংশ আন্তর্জাতিক পক্ষ থেকে। সালিশি বা মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত রায় দেওয়া হয়, ফলে আদালতের দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমে। ব্যবসায়ীরা জানেন যে তাদের বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, তাই বিনিয়োগে আগ্রহ বেশি থাকে। সিঙ্গাপুর শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নয়, বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এবং চীনও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করেছে। ভিয়েতনামে বিনিয়োগকারীরা অনলাইনে আবেদন জমা দিয়ে অনুমোদন, কর নিবন্ধন, জমি বরাদ্দসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন।মালয়েশিয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সাপোর্ট সেন্টার রয়েছে, যেখানে তারা ব্যবসা নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। এই ধরনের উদ্যোগ ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ বাঁচায়, আস্থা বাড়ায় এবং নতুন উদ্যোগকে উৎসাহিত করে।বাংলাদেশে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। মামলা-হয়রানি কমাতে আমাদের একটি আন্তর্জাতিক মানের সালিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিরোধ দ্রুত সমাধান হবে এবং আদালতের দীর্ঘসূত্রতা কমে যাবে। বর্তমানে BIDA’র ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু থাকলেও তা পূর্ণ কার্যকর নয়। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অনলাইনে আবেদন করলেও তারা এখনও বিভিন্ন দফতরে যেতে বাধ্য হন। যদি এই সংস্কৃতি বদলানো যায়, তবে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ অনেক উন্নত হবে।কর প্রশাসনের স্থিতিশীলতা এবং সহজলভ্যতা বিনিয়োগ বাড়াতে অপরিহার্য। বিনিয়োগকারীরা জানেন, যখন কর নীতি পরিবর্তনশীল থাকে, তখন বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়। ভারতের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি GST চালু করে কর ব্যবস্থাকে একক কাঠামোয় আনে এবং ব্যবসায়ীদের পূর্ব পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কর নীতি গ্রহণ করতে পারে।অবকাঠামো ও প্রকল্প বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়ানও জরুরি। ডিজাইন অনুমোদনের আগে বিস্তৃত সমীক্ষা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা উচিত। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরে বিশেষায়িত প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, যারা আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখেন। বাংলাদেশও যদি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারে, তাহলে সময় ও খরচ কমানো সম্ভব।রফতানিমুখী শিল্পে প্রযুক্তি ব্যবহারও অপরিহার্য। ল্যাব টেস্ট, সার্টিফিকেশন এবং যন্ত্রপাতি অনুমোদনে সময়ক্ষেপণ কমাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পোশাক, চামড়া, ওষুধ এবং আইটি খাতসহ সব শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শুধু অর্থনৈতিক নীতি যথেষ্ট নয়; আস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মামলা-হয়রানি কমানো, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা, দ্রুত সালিশি ব্যবস্থা এবং স্থিতিশীল কর নীতি- সব মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়।বাংলাদেশে যদি এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তারা ফিরে আসবেন, নতুন শিল্প-প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বেড়ে যাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় হবে এবং একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব শিল্প পরিবেশ গড়ে উঠবে।
এখানে মূল বিষয় হলো- উন্নয়ন শুধু নতুন প্রকল্প নেওয়ার মাধ্যমে সম্ভব নয়। মামলা-হয়রানি কমানো, প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা, দ্রুত সালিশি ব্যবস্থা, স্থিতিশীল কর নীতি, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। সঠিক সময়ে সঠিক সংস্কার করা গেলে, বাংলাদেশ দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত হতে সক্ষম।লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।[email protected]