চীনের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ সরবরাহে আধিপত্য ভাঙতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এক বছরের মধ্যে দেশটির খনিজ উদ্বৃত্ত হওয়ার যে দাবি ট্রাম্প করেছেন, তা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্বব্যাপী পরিশোধিত রেয়ার আর্থের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে চীন। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক যান, সব প্রযুক্তি খাতে এসব খনিজ অপরিহার্য। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের বড় অস্ত্র হিসেবে এই খনিজের রফতানি নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগাচ্ছে বেইজিং।
সম্প্রতি চীন বিদেশে প্রক্রিয়াকৃত খনিজের সামান্য পরিমাণের ওপরও রফতানি নিয়ন্ত্রণ জারি করেছে। এতে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যাহত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর জবাবে ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে।
সোমবার ট্রাম্প প্রশাসন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারের এক চুক্তি ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য হলো, দুষ্প্রাপ্য খনিজ উৎপাদনে নতুন প্রকল্প গড়ে তোলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। আগামী ছয় মাসে দুই দেশ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতর পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় বছরে ১০০ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যালিয়াম শোধনাগার স্থাপন করবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক ২.২ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের আগ্রহপত্র দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রেয়ার আর্থ মজুত রয়েছে। দেশটি গত পাঁচ বছরে উৎপাদন বাড়িয়ে বিশ্বের অর্ধেক লিথিয়ামও সরবরাহ করছে, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে অপরিহার্য উপাদান।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হাসেট বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার সম্পৃক্ততা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চীনের রেয়ার আর্থ জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, রেয়ার আর্থ নির্ভর শিল্পে মাত্র ১০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক জন মাভরোজেনেস বলেছেন, চীন বিশ্ব থেকে অনেক এগিয়ে। স্বল্পমেয়াদে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, এই খাত গড়ে তুলতে অন্তত এক দশক লাগবে। এখনও আমাদের হাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিক, শক্তি এবং পরিবেশগত সমাধান নেই।
অন্যদিকে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিক ভ্যালেন্টা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া চুক্তি অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে বড় ভূমিকা রাখবে। ২০২৭ সালের মধ্যে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় একটি রেয়ার আর্থ পরিশোধনাগার চালু হবে। আরও কয়েকটি প্রকল্প প্রস্তুত আছে, শুধু শেষ ধাপের অর্থায়ন প্রয়োজন।
ট্রাম্প প্রশাসন মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে বিকল্প সাপ্লাই চেইন গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে। পাকিস্তানও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরল খনিজ সরবরাহ চুক্তি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা আধিপত্য ভাঙতে সময় লাগবে।এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে তার রেয়ার আর্থের ৭০ শতাংশ আমদানি করতে হয় চীন থেকে। যা দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য একটি বড় কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবেই রয়ে গেছে।
সূত্র: সিএনএন