বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়েছে জনপ্রিয় সঙ্গীত ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটক। কিশোর-কিশোরীদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ানোর অভিযোগে প্ল্যাটফর্মটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের তদন্ত শুরু হয়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতে সতর্কতা জানাচ্ছে বাংলাদেশের ডিজিটাল অধিকার কর্মী ও ভোক্তা সংগঠনগুলো। তবে এ বিষয়ে সরকার এখনও নীরব।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক নজরদারি সংস্থা গ্লোবাল উইটনেসের সাম্প্রতিক এক তদন্তে উঠে এসেছে যে, টিকটকের অ্যালগরিদম ১৩ বছর বয়সী ব্যবহারকারীদেরও প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়বস্তু এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট দেখায়- যা প্ল্যাটফর্মটির ন্যূনতম বয়সসীমারই লঙ্ঘন।
প্রতিষ্ঠানটির গবেষকেরা ১৩ বছর বয়সী কিশোরের নামে একটি ফেইক অ্যাকাউন্ট খুলেন। সেখানে তারা দেখেন, ব্রাউজিং হিস্ট্রি না থাকলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভিডিও ও সার্চ সাজেশন আসতে শুরু করে টিকটকে। গবেষকেরা একে বলেছেন ‘অ্যালগোরিদমিক গ্রুমিং’, অর্থাৎ টিকটক শুধু ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকাতে ব্যর্থই নয়, বরং কিশোরদের সেদিকে ঠেলেও দিচ্ছে।
এই অনুসন্ধানের ফলাফল মিলেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যালগোরিদমিক ট্রান্সপারেন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষণার সঙ্গেও। সেই গবেষণায় দেখা যায়, টিকটকের ‘ফর ইউ’ ফিড কিশোর ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট অনেক বেশি পরিমাণে দেখায়।
কেনিয়া, ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রে হওনা এই গবেষণায় দেখা যায়, ১৩ বছর বয়সী ‘ফেইক’ অ্যাকাউন্টগুলোতে যেসব ভিডিও দেখানো হয়, তার প্রায় অর্ধেকই ক্ষতিকর বা আত্মহত্যা- সম্পর্কিত; যার পরিমাণ সাধারণ অ্যাকাউন্টগুলোর তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।
আর বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে টিকটক জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি। ফলে এই বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘টিকটকের ক্ষতিকর প্রভাব বহুদিন ধরেই “ওপেন সিক্রেট”। আমরা আত্মহত্যা, জুয়া আর অর্থপাচারের ঘটনাও দেখেছি, যেগুলো টিকটক-সংশ্লিষ্ট। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
তিনি বিটিআরসি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়কে যুক্তরাজ্যের শিশু সুরক্ষা নীতির মতো ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান- যেমন রাতে নোটিফিকেশন নিষিদ্ধ করা, কনটেন্ট ফিল্টার চালু করা এবং বয়স যাচাইয়ের কড়াকড়ি আরোপ করা।
টিকটক দাবি করে, তারা কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য ৫০টিরও বেশি সুরক্ষা ফিচার ও প্রাইভেসি ফিচার চালু করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, কনটেন্ট ফিল্টার এবং ডিফল্ট প্রাইভেট প্রোফাইল। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এগুলো অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর।
টিকটক সম্প্রতি ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের কমিউনিটি গাইডলাইনস অ্যানফোর্সমেন্ট রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, মোট মুছে ফেলা ভিডিওর ৩০ শতাংশ ‘সংবেদনশীল বা প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, আর প্রতি মাসে ছয় মিলিয়ন অপ্রাপ্তবয়স্ক অ্যাকাউন্ট এআই-নির্ভর যাচাই প্রক্রিয়ায় মুছে ফেলা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রক্রিয়া এখনও অস্বচ্ছ এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
টিকটকের অ্যালগরিদম নিয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্রেও অভিভাবকেরাও মামলা দায়ের করছেন। তাদের অভিযোগ, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক দুর্বলতাকে টার্গেট করে ভিডিও দেখায় টিকটক।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও জটিল। দেশে ২৫ বছরের নিচে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি ছাড়িয়েছে, কিন্তু স্কুলগুলোতে ডিজিটাল শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে একজন সাইবার নীতি বিশ্লেষক বলেন, ‘ঝুঁকিটা শুধু বাচ্চারা কী দেখছে তাতে নয়, বরং অ্যালগরিদম ওদের কী দেখাতে চাচ্ছে—এবং কেন।’
বাংলাদেশে এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেফটি ফ্রেমওয়ার্ক নেই। বিটিআরসি মাঝে মাঝে সতর্কতা জারি বা সাময়িকভাবে কোনও প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে, কিন্তু অ্যালগোরিদমিক জবাবদিহি, শিশু সুরক্ষা বা প্ল্যাটফর্মের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনও আইন নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিষয়ে কোনও আইন না থাকায় শিশুদের শোষণ ও মানসিক ক্ষতি ঝুঁকিতে পড়ছে। তারা সরকারের কাছে তিনটি প্রধান পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। এগুলো হলো- জাতীয় ডিজিটাল সেফটি কমিশন গঠন, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা মানদণ্ড এবং শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি চালু করা।
এছাড়া, তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনের সহযোগিতারও পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে তদন্ত ও সমালোচনার মধ্যেও টিকটক তাদের অবস্থান রক্ষা করছে, প্লাটফর্মটি দাবি করছে যে তারা কমিউনিটি গাইডলাইন অনুযায়ী কাজ করে এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট স্বপ্রণোদিতভাবে সরিয়ে ফেলে।