বন্ধ ঘোষণা এমটিভি, নেপথ্যে আছে যা

বন্ধ ঘোষণা এমটিভি, নেপথ্যে আছে যা

সংগীত ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায় যেন শেষের পথে। চলতি বছরের শেষ দিনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমটিভি-এর পাঁচটি মিউজিক চ্যানেল। এরমধ্যে রয়েছে এমটিভি মিউজিক, এমটিভি এইটিজ, এমটিভি নাইনটিজ, ক্লাব এমটিভি এবং এমটিভি লাইভ। কেবল মূল চ্যানেলটি টিকে থাকবে, যা বর্তমানে প্রধানত রিয়েলিটি শো সম্প্রচার করে।

১৯৮১ সালে এই গ্লোবাল মিউজিক টিভির আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে সংগীতের প্রচারে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ২৪ ঘণ্টা মিউজিক ভিডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে এমটিভি বদলে দেয় শিল্পী–বিপণনের ধরন, আর জন্ম দেয় এক নতুন তারকা-সংস্কৃতির—যেখানে মাইকেল জ্যাকসন ও ম্যাডোনার মতো শিল্পীরা তাদের মিউজিক ভিডিওর মাধ্যমেই গড়ে তোলেন নিজেদের অবিস্মরণীয় অবস্থান।

কিন্তু চার দশক পর, সেই যুগ যেন অবসানের পথে।

স্বাধীন শিল্পী হান্না ডায়মন্ড বললেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে এমটিভি কেবলই এক নস্টালজিক স্মৃতি হয়ে আছে। অনেক আগেই এটি সংগীত জগতের আলোচনার বাইরে চলে গেছে। তাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শুনে অবাক হইনি।’

তার মতে, এখন মিউজিক ভিডিও প্রকাশের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ইউটিউব।

তবে এমটিভির মিউজিক চ্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন প্রশ্ন উঠেছে—আজকের যুগে মিউজিক ভিডিওর অবস্থান কোথায়?

অ্যাকাডেমি ফিল্মস-এর ডেভেলপমেন্ট প্রধান জেনিফার বাইর্ন বলেন, ‘আগের মতো রেকর্ড লেবেলগুলো এখন আর ভিডিও নির্মাণে বিনিয়োগ করতে চায় না। এখন তাদের বাজেট ছড়িয়ে দিতে হয় ডিজিটাল মার্কেটে—শুধু একটার জন্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে একটাই তিন মিনিটের ভিডিও বানাতে হতো। এখন ভাবতে হয়—কীভাবে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আলাদা আলাদা সংস্করণে সেটা পৌঁছানো যায়।’

লন্ডনের পরিচালক আইরিস লুজ, যিনি পিংকপ্যানথেরেস ও জর্জ রাইলির জন্য ভিডিও বানিয়েছেন, তিনি জানান—এখন ভিডিওর বাজেট নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ‘কতবার এমন হয়েছে, একটা সাধারণ আইডিয়া দিই—একটা বাড়িতে চারজন মানুষ, সহজ শুট—তবু প্রযোজকরা বলে, এটা করতে ৫০ লাখ পাউন্ড লাগবে! বুঝি না এসব কীভাবে হিসাব করে!’

তবে লুজ ও বাইর্ন দুজনেরই মত—এমটিভির অবসান মিউজিক ভিডিওর অস্তিত্বকে তেমন প্রভাবিত করবে না। jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68f4980eb6b08" ) ); লুজ বলেন, ‘এখন ভিডিওগুলো প্রচারের হাতিয়ার নয়, বরং শিল্পীর পরিচয় ও সংযোগ তৈরির মাধ্যম। টিকটক আর স্বাধীন সংগীতশিল্পীদের উত্থানের পর মানুষ এখন গান প্রকাশ করে সঙ্গে সঙ্গে। তাই ভিডিওও তৈরি হয় সেই মুহূর্তের অনুভব তুলে ধরতে—১৫ বছর আগের মতো বড়সড় প্রচারের জন্য নয়।’

স্বাধীন শিল্পী ডায়মন্ড বলেন, ‘আমি যে ভিডিওগুলো বানিয়েছি, সেগুলো কেবল ভাগ্য, পরিশ্রম ও বহু বছরের অপেক্ষার ফসল। এখনকার যুগে মিউজিক ভিডিও বানানোর বাজেট পায় শুধু বড় লেবেল আর বড় তারকারা। স্বাধীন শিল্পীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।’

এদিকে পরিচালকরা বলছেন, তারাও পড়েছেন বিপাকে। বাইর্ন বলেন, ‘আগে কোনও শিল্পী সরাসরি পছন্দের পরিচালককে ডাকত। এখন একটা ভিডিওর জন্য ১০ জন পরিচালক প্রস্তাব দেয়, সবাই ফ্রি শ্রম দেয়—দারুণ সব আইডিয়া লিখে, কিন্তু তার কোনও পারিশ্রমিক নেই।’

তার কথায়, ‘এখন আর কেউ এসব ভিডিও থেকে আয় করতে পারে না—না পরিচালক, না প্রোডাকশন কোম্পানি। তবুও আমরা করি, কারণ এটা পরিচালক হিসেবে নিজের ভাষা খুঁজে পাওয়ার অপরিহার্য মাধ্যম।’

তবুও আশাবাদী বাইর্ন। তার মতে, ‘‘মিউজিক ভিডিও এখনও সিনেমা নির্মাতাদের স্কুলের মতো। ‘এভরিথিং এভরিহোয়ার অল এট ওয়ানস’–এর পরিচালক দ্য ড্যানিয়েলসরাও শুরু করেছিলেন মিউজিক ভিডিও দিয়ে—আর আজ তারা অস্কারজয়ী।’’

সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এমটিভির মূল প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট ব্র্যান্ডটিকে নতুনভাবে পুনর্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে। শিল্পী ডায়মন্ড মনে করেন, সংগীত জগত এত দ্রুত বদলায় যে ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।

তার ভাষায়, ‘ভাবুন তো—ভিনাইল রেকর্ড আবার ফিরে এসেছে! ভিডিওও তাই। অ্যালবামের মতোই মিউজিক ভিডিও কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না। এগুলো সংগীতের যতিচিহ্ন—সবসময় থাকবে।’

এমটিভি একটি মার্কিন কেবল টেলিভিশন চ্যানেল, যা শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালে।

চ্যানেলটি মূলত ২৪ ঘণ্টা ধরে সংগীত ভিডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ৮০-এর দশকে এটি এক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে মাইকেল জ্যাকসন, ম্যাডোনা, প্রিন্সসহ অসংখ্য তারকার ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে এই প্ল্যাটফর্মের হাত ধরে।

পরবর্তীতে এমটিভি শুধুমাত্র সংগীত নয়, বরং রিয়েলিটি শো, টিন ড্রামা এবং যুবপ্রজন্মকেন্দ্রিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে নিজের পরিচয় বদলে ফেলে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দর্শক টেলিভিশন থেকে সরে গিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগীত উপভোগ করতে শুরু করায় চ্যানেলটির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।

ফলে, এমটিভি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ঘোষণা করেছে— তারা তাদের মিউজিক চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেবে এবং ভবিষ্যতে বিবিধ কনটেন্টকে ডিজিটাল ও অনলাইন মাধ্যমে আরও প্রসারিত করার দিকে জোর দেবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও টাইমস অব ইন্ডিয়া

Comments

0 total

Be the first to comment.

এক টিকিটে তিন নাটক! BanglaTribune | বিনোদন

এক টিকিটে তিন নাটক!

নাট্যপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য সন্ধ্যা অপেক্ষা করছে! চারুনীড়ম থিয়েটার উদযাপন করতে যাচ্ছে তাদের ১০০তম ম...

Sep 13, 2025

More from this User

View all posts by admin