ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রধান সড়ক কাউতলী থেকে ঘাটুরা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ। বিকল্প কোনো সড়ক না থাকায় এই সড়কে দিনভর তীব্র যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন শহরবাসী। সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এই সড়কে যানজট লেগে থাকে। যানজট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ শহরবাসীর।
ট্রাফিক বিভাগ ও স্থানীয় লোকজনের মতে, বিকল্প সড়ক না থাকা, সরু রাস্তা, ফুটপাত দখল, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যান চলাচল, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান না চালানো, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও ট্রাফিক আইন অমান্য করা—এই ৮ কারণে যানজট দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া শহরে লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইক ও রিকশার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে অনুমোদন ছাড়া অনেক রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে। পৌরসভা এসব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
জেলা ট্রাফিক পরিদর্শক মীর আনোয়ার হোসেন বলেন, শহরে অনুমোদনের কয়েক গুণ বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলছে। একটির লাইসেন্সে ১০-১২টি গাড়ি নামানো হচ্ছে। নকল লাইসেন্স শনাক্ত করার সক্ষমতা বা কোনো যন্ত্র ট্রাফিক পুলিশের নেই। এসব রিকশা-ইজিবাইকের চলাচল বন্ধে অভিযান চালাতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে, পুলিশ সহায়তা করবে। এ ছাড়া বিকল্প সড়ক না থাকা, ফুটপাত দখল, সরু রাস্তা ও ভাঙাচোরা অবস্থাও যানজটের বড় কারণ।
পৌরসভা সূত্র জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার জনসংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪১। শহরের সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যাংক, বাজার, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে এই প্রধান সড়কের দুই পাশে। ফলে শহরের সব নাগরিককেই যাতায়াতের জন্য কাউতলী-ঘাটুরা সড়ক ব্যবহার করতে হয়।
আশুগঞ্জের ফিরোজ মিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক আজিজুর রহমান বলেন, শহরটি দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। হাঁটাপথে পাঁচ মিনিটের দূরত্ব যানজটের কারণে রিকশায় যেতে লাগে আধা ঘণ্টা। বিকল্প সড়ক নেই, আর ইজিবাইকে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করে। দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
জেলা ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যানজট নিরসনে শহরের কাউতলী, টিএ রোড, ঘোড়াপট্টি সেতু, মঠের গোড়া, পুরাতন কোর্ট রোড মোড়, কুমারশীল মোড়, ল্যাবএইড মোড়, বিরাসার, মেড্ডা এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করে।
পৌরসভার লাইসেন্স শাখা সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার আওতাধীন শহরের বিভিন্ন সড়কে চলাচলের জন্য পাঁচ হাজার প্যাডেলচালিত রিকশার লাইসেন্স ছিল। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ২ হাজার ৬০০ রিকশার লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। পরে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও পৌরসভার সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্যাডেলচালিত রিকশা বাদ দিয়ে দুই হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং নতুন করে আরও এক হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে পৌরসভা থেকে ৩ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ১ হাজার ৫০টি ইজিবাইককে লাইসেন্স দেওয়া হয়। এরপর নতুন করে আর কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি।
সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কের কাউতলী, কালীবাড়ি মোড়, টিএ রোড, ঘোড়াপট্টি সেতু, মঠের গোড়া, পুরাতন কোর্ট রোড মোড়, হাসপাতাল রোড, কুমারশীল মোড়, পাইকপাড়ায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে। সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে লাইসেন্সবিহীন রিকশা ও ইজিবাইক যাচাইয়ে পৌরসভার কোনো তদারকি বা উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কুমিল্লা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াতকারী যানবাহন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। এ ছাড়া আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত চার লেন মহাসড়কের নির্মাণকাজ চলার কারণে সন্ধ্যা সাতটার পর থেকেই এ সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক যাতায়াত করে।
জেলা সম্মিলিত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আবদুন নূর বলেন, মানুষ যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। দ্রুত লাইসেন্সবিহীন রিকশা-ইজিবাইক বন্ধ করতে হবে।
পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মোহাম্মদ আল-মাসাদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে শহরের প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা লাইসেন্সের তিন গুণ, সংখ্যায় যা আনুমানিক ৯ হাজার এবং ইজিবাইক লাইসেন্সের দ্বিগুণ, ২ হাজারের বেশি।
পৌরসভার প্রশাসক ও জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শঙ্কর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘ধারণক্ষমতার বেশি গাড়ি চলাচল করছে সত্য। কিছু অভিযোগ আমার কাছেও এসেছে। কয়েকটি অভিযান চালিয়েছি। একজনের নামে ১০০-২০০ করে লাইসেন্স দিয়েছে। গাড়ির নবায়ন দিয়েছি, তবে নতুন লাইসেন্স দিচ্ছি না। দ্রুত অভিযান শুরু হবে।’