বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রচার শুরু, প্রার্থীদের ছোটাছুটিতে উৎসবমুখর ক্যাম্পাস

বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রচার শুরু, প্রার্থীদের ছোটাছুটিতে উৎসবমুখর ক্যাম্পাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে আজ সোমবার। প্রার্থীদের অনেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনভর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালিয়েছেন। আবার কেউ কেউ লিফলেট ছাপাতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন।

বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে পরিবহন মার্কেটে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমানুল্লাহ আমান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীসহ নেতা-কর্মীদের কাছে লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেল রাকসুর নির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থী আবদুল্লাহ মুনাওয়ার সিফাতকে। স্বতন্ত্র এই প্রার্থী ছাত্রদল সভাপতির কাছে দোয়া চাইলেন। জবাবে তিনি বললেন, ‘ফুল সাপোর্ট’ (পূর্ণ সমর্থন)।

নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার দিন থেকে ভোট গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা আগপর্যন্ত সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা করা যাবে। প্রচারণার সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। গতকাল রোববার বিকেলে ব্যালট নম্বর বরাদ্দ এবং রাতে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে ওই দিন বিকেল থেকে বৃষ্টি থাকায় প্রচারণায় নামতে পারেননি প্রার্থীরা।

আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিন আজ সকাল ১০টা থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়। থেমে থেমে বৃষ্টি চলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই প্রচারণায় নামেন প্রার্থীদের অনেকে। তাঁরা টুকিটাকি চত্বর, পরিবহন মার্কেট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনের ভ্রাম্যমাণ খাবার ও চায়ের হোটেলের ছাউনিতে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচার চালান।

ইসলামী ছাত্রশিবির মনোনীত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের ভিপি (সহসভাপতি) প্রার্থী মোস্তাকুর রহমানকে (জাহিদ) সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মমতাজউদ্দিন একাডেমিক ভবন ও বুদ্ধিজীবী চত্বরের সামনে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। একই সময়ে প্যানেলের জিএস (সাধারণ সম্পাদক) প্রার্থী ফাহিম রেজা সিরাজী ও রবীন্দ্রনাথ ভবনের সামনে প্রচার চালান।

প্রচারণার এক পর্যায়ে সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আচরণবিধি লঙ্ঘন না হওয়ার পরও যারা আমাদের সমালোচনা করছে, তাদেরকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। তারা নিজেদের প্রচারণায় সময় ব্যয় না করে, আমাদের সমালোচনায় সময় ব্যয় করছে। আসলে এতে আমাদেরই একটা প্রচার হচ্ছে। আমরা কাদা ছুড়াছুড়ি করতে চাই না। আমরা নিজেদের কাজগুলো করে যেতে চাই। অনেক ছাত্রসংগঠন বিধি লঙ্ঘন করে আগেই লিফলেট বিতরণ করেছে, এটা নিয়ে আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় অভিযোগ করব।’

বেলা দেড়টার দিকে ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ভবন এলাকা, চায়ের স্টল, খাবারের দোকানে লিফলেট নিয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। এই দলের জিএস প্রার্থী নাফিউল ইসলাম মমতাজউদ্দিন একাডেমিক ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেছেন। প্যানেলের এজিএস প্রার্থী জাহিন বিশ্বাসকে (এষা) এ সময় লিফলেট হাতে দেখা গেছে। তিনি তাঁর ব্যালট নম্বর ৫ বোঝাতে হাত তুলে পাঁচ আঙুল দেখাচ্ছিলেন।

‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী তাসিন খান। তিনি সকাল থেকে ব্যস্ত ছিলেন লিফলেট ছাপাতে। কাজ শেষে দুপুরের পর তিনিসহ তাঁর প্যানেলের সদস্যরা প্রচারণা চালান। তাঁকে দেখা গেল শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দোয়া চেয়ে প্রচারণা চালাতে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি প্যানেলের প্রার্থীদেরও প্রচারে নামতে দেখা গেছে।

নির্বাচনী আচরণবিধিতে বলা হয়েছে, একাডেমিক ভবনের অভ্যন্তরে মিছিল বা সমাবেশ এবং শ্রেণিকক্ষের অভ্যন্তরে কোনো নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। তবে ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী নাফিউল ইসলামের (জীবন) বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে একটি শ্রেণিকক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার কারণ জানতে চেয়ে ভিডিও ধারণ করার সময় সাংবাদিককে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আবহাওয়াজনিত কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি নাফিউল ইসলামের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বিভাগের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাইরে বসার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় তারা বিভাগে যেতে বলে। এটা একটা মিসটেক (ভুল) হয়ে গেছে।’

আচরণবিধিতে নির্বাচনী সভা, সমাবেশ ও শোভাযাত্রার বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রার্থী ও ভোটার ছাড়া অন্য কেউ কোনোভাবেই কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচারণা চালাতে পারবেন না। নির্বাচনী প্রচারণায় শুধু সাদা-কালো পোস্টার ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো ভবনের দেয়ালে নির্বাচনসংক্রান্ত লেখা ও পোস্টার লাগানো যাবে না।

রাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের কারসাজির সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ভেতরে যাঁরা নির্বাচন কমিশনে আছেন বা প্রশাসনে আছি, আমরা কারসাজির ক-ও বুঝি না। সারা জীবনে অন্তত আমি বলতে পারি, আমার এই বয়স পর্যন্ত আমি কখনো কারসাজি করিনি এবং কোনো ধরনের কারসাজির ভেতরে জড়িত হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও আমাদের নেই আরকি। এই আস্থাটা রাখতে হবে এবং এই আস্থার প্রতিদান আপনারা পাবেন।’

আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘রাকসু কী এবং কেন’ শিরোনামে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য এ কথা বলেন। এই সেমিনারে কেন্দ্রীয় সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট নির্বাচনের প্রার্থীরা ছিলেন।উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব একটি ভালো পরিবেশে, সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে ফ্রি ও ফেয়ার (অবাধ ও সুষ্ঠু) নির্বাচন আয়োজন করা। এই নির্বাচনে কে জিতবে, কে হারবে, কোন প্যানেলের কী মতাদর্শ, সেটা আমাদের বিষয় নয়। কে কীভাবে ভাবছে, কার সঙ্গে কোন দলের সংশ্লিষ্টতা আছে, আমাদের তরফ থেকে এসবের গুরুত্ব নেই।’

প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি সুষ্ঠুভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে উপাচার্য বলেন, ‘সুন্দর একটি রাকসু নির্বাচন শুধু আমাদের একার চেষ্টায় সম্ভব নয়। আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।’

নির্বাচনে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরির ওপর জোর দিয়ে উপাচার্য বলেন, ‘জিততে গেলে সবার আগে হারা শিখতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা হারতেই শিখিনি। হেরে গেলেই খেলা ভালো হয়নি—এই বাজে প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তবে যুক্তিগ্রাহ্য অভিযোগ থাকলে অবশ্যই করবেন, নির্বাচন কমিশন তার সুরাহা করবে। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না।’

সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান। রাকসু কোষাধ্যক্ষ ও নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মো. সেতাউর রহমান সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন। নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক পারভেজ আজহারুল হকের সঞ্চালনায় আরেক কমিশনার অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হান্নান আলোচনা করেন। রাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোহা. এনামুল হক।

রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য দুই দিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে নির্বাচনের আগের দিন ও ভোট গ্রহণের দিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ আজ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ইফতিখারুল আলম বলেন, ‘একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থানান্তরের জন্য ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ যাবতীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’

Comments

0 total

Be the first to comment.

গাজীপুরে নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকসহ ৪ জনকে মারধর Prothomalo | জেলা

গাজীপুরে নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাংবাদিকসহ ৪ জনকে মারধর

গাজীপুরের কাশিমপুরে এক নারীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় সাভারে কর্মরত বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন...

Sep 24, 2025

More from this User

View all posts by admin