ব্যস্ত নগরী ঘুমায় নিয়ন আলোয়, জেগে থাকে শৈশব হারানো মেয়েরা

ব্যস্ত নগরী ঘুমায় নিয়ন আলোয়, জেগে থাকে শৈশব হারানো মেয়েরা

মানুষের ভিড়ে ঠাসা কর্মব্যস্ত ঢাকা শহর রাতের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে। নিয়ন আলোয় তখন রাজধানীর সড়কগুলোতে অন্যরকম মুগ্ধতা। তবে এই নিয়ন আলোতেও লেগে থাকে এক রূঢ় বাস্তবতা। জেগে ওঠে এক ভিন্ন জগৎ—যেখানে জীবনের মানে কেবল বেঁচে থাকা। এই শহরের অলিগলিতে হাজারো মেয়েশিশু প্রতিদিন রাত কাটায় ভয়, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তায়।

ফার্মগেটে যখন যানজট কমে আসে, দোকানের শাটার নামে, তখন কয়েকজন কিশোরী জেগে থাকে ছেঁড়া কম্বলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। ১৬ বছর বয়সী রিমা (ছদ্মনাম) বলে, “আমি রাতে ঘুমাই না। ভয় লাগে। যদি কেউ এসে ক্ষতি করে?”

শৈশবে মা-বাবা হারিয়ে চাঁদপুর থেকে নানীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিল রিমা। গৃহকর্মীর কাজ করা নানীকেও সে হারিয়েছে শহরের ভিড়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে ফুল বিক্রি শুরু করে রিমা। এক রাতে একদল দুর্বৃত্ত ছিনিয়ে নেয় তার কষ্টে উপার্জিত সব টাকা। এরপর থেকে তিনজন মেয়ের সঙ্গে ফার্মগেটের ফুটপাথে ঘুমায় রিমা। তার ভাষ্য, “একসঙ্গে থাকলে অন্তত চিৎকার দিতে পারি।”

কারওয়ান বাজার এলাকায় ১৫ বছরের রুবিনা (ছদ্মনাম) সন্ধ্যা নামতেই মাটিতে প্লাস্টিকের শিট বিছায়। ভয়ার্ত কণ্ঠে সে বলে, “জানি না, কে এসে টেনে নিয়ে যাবে। প্রতিদিন রাতে ভয় নিয়ে ঘুমাই।”

মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে থাকে ১৪ বছরের শীলা (ছদ্মনাম)। এক ব্যক্তি একদিন খাবার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে তাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছিল। তার ভাষ্য, “পুলিশও আমাকে তাড়িয়ে দেয়, কিন্তু যাব কোথায়?”

এই কিশোরীদের জন্য ঢাকার রাস্তাই এখন ঘর, আবার ভয়ও। রেলস্টেশন, টার্মিনাল, উড়ালসেতু—কোনোটিই তাদের জন্য নিরাপদ নয়। তাদের শৈশব মিলিয়ে গেছে টিকে থাকার সংগ্রামে।

ভয় আর অনিশ্চয়তার জীবন

ইউনিসেফের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু রাস্তায় বসবাস করে, যার এক-তৃতীয়াংশ মেয়ে। ইউনিসেফ ও ব্র্যাকের এক যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার ৮২ শতাংশ রাস্তার মেয়েশিশু যৌন বা মানসিক নির্যাতনের শিকার, আর ৬৭ শতাংশ একা ঘুমাতে ভয় পায়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশুই খোলা জায়গায়, আলো বা নিরাপত্তা ছাড়া ঘুমায়।

২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব রাস্তার শিশুর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও অধিকাংশ মেয়েশিশু সেখানে পৌঁছায় না, কিংবা নির্যাতনের ভয় ও প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কায় যায় না।

এ প্রসঙ্গে রিমা বলে, “একবার এক সমাজকর্মীর সঙ্গে গিয়েছিলাম। তারা বলেছিল আমি অনেক বড়। এরপর আর যাইনি।”

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৭টি সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে ৮,৮৬২ জন মেয়েশিশু সহায়তা পেয়েছে; বর্তমানে সেখানে মাত্র ১,৪৪৮ জন রয়েছে। বাকিরা রাস্তাতেই রয়ে গেছে।

একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা সবাইকে সাহায্য করতে চাই, কিন্তু সক্ষমতা সীমিত। বাজেট সংকটের কারণে অনেক শিশুকেই নিজেদের মতো করে টিকে থাকতে হয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাস্তায় থাকা অধিকাংশ মেয়ে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে (ফুল, চা বা ছোট পণ্য বিক্রি করে)। তাদের মাসিক আয় গড়ে দুই থেকে তিন হাজার টাকা, যা কেবল খাবারের খরচেই শেষ হয়।

রাস্তায় থাকা এসব মেয়ে শিশুদের প্রায় ৪২ শতাংশ মাদকাসক্ত। তাদের ধারণা, “গ্লু শোঁকা বা গাঁজা খেলে ভয় ছাড়া ঘুমানো যায়।”

‘শৈশব নয়, বেঁচে থাকা’

সমাজকর্মীদের মতে, এই মেয়েদের অনেকেই নির্যাতনের শিকার পরিবার থেকে পালিয়ে এসেছে। তবে রাস্তায় এসে তারা পড়েছে নতুন সহিংসতার মধ্যে।

‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’-এর সমাজকর্মী শায়লা আক্তার বলেন, “তারা পরিবার ও রাস্তা—দুই জায়গার ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছে। তারা অবহেলার অদৃশ্য শিকার।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালমা বেগম বলেন, “সমাজ এখনও তাদের অপরাধী হিসেবে দেখে; সংকটে থাকা শিশু হিসেবে নয়। তাদের জীবন সংগ্রামের । শিশু হিসেবে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে; মেয়ে হিসেবে থাকে যৌন হুমকি ও বঞ্চনায়। তাদের প্রয়োজন অধিকারভিত্তিক সুরক্ষা; সহানুভূতি নয়।”

হীড বাংলাদেশের হাউস অব হোপ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের চাইল্ড সেফটি নেটসহ বিভিন্ন এনজিও এই শিশুদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়, খাদ্য ও পরামর্শ সেবা দিচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় এসব উদ্যোগ অতি সামান্য। অধিকাংশ প্রকল্পই স্বল্পমেয়াদি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। ফলে লাখো শিশুর সহায়তা অপ্রতুল।

তাদের প্রতি জনসাধারণের সহানুভূতিও কম। পথচারীরা অনেক সময় চোখ ফিরিয়ে নেয়, ধরে নেয় মেয়েগুলো চোর বা নেশাখোর।

তবে মেয়েগুলোর চাওয়া খুব সাধারণ; ভয়হীন বিশ্রামের একটিমাত্র জায়গা।

ভোর হওয়ার আগে ফার্মগেটে রিমা যখন তার কম্বল গুটিয়ে রাখছিল, তখন বাসের ইঞ্জিন আবার গর্জে উঠলো।

সে বলে,“প্রতিটি রাত বেঁচে থাকা মানে একেকটা যুদ্ধ জেতা। কিন্তু একা লড়তে লড়তে আমি ক্লান্ত।”

Comments

0 total

Be the first to comment.

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে BanglaTribune | অন্যান্য

জুলাইয়ের মামলা থেকে বাঁচানোর কথা বলে চাঁদাবাজি, ৩ সমন্বয়ক কারাগারে

জুলাই আন্দোলনের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং সাড়ে পাঁ...

Sep 12, 2025

More from this User

View all posts by admin