চলতি দশকের শেষ নাগাদ আবারও চাঁদে মানুষ পাঠাতে তোড়জোড় শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্ভাব্য সে অভিযানে তাদের যেমন চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রয়েছে, তেমনি আছে নভোযান নিয়ে কিছু জটিলতা।
যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় বিজ্ঞান প্রচারক ও প্ল্যানেটারি সোসাইটির প্রধান নির্বাহী বিল নাই বলেছেন, নিশ্চিতভাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠাবে চীন। এটি মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।
২০২৭ সালের মাঝামাঝি চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনা করছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা। অন্যদিকে, চীনের ২০৩০ সাল নাগাদ চাঁদে মানুষ পাঠাতে চায় চীন। নাসার নতুন চন্দ্রাভিযান প্রকল্পের নাম আর্টেমিস থ্রি। এ অভিযানে তাদের পছন্দ স্পেসএক্সের 'স্টারশিপ'। এখন পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে বড় রকেট ব্যবস্থা হলেও এর চূড়ান্ত সফলতা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। আর এই নভোযান নিয়েই আর্টেমিস থ্রির সফলতা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
স্টারশিপের বিকাশ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত ১০টি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালিত করেছে নভোযানটি, যার ছয়টটিই আংশিক বা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এর সর্বশেষ প্রোটোটাইপ পরীক্ষার সময় ভূমিতেই বিস্ফোরিত হয়।
এগারোতম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ‘ফ্লাইট ১১’ পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্পেস এক্স। দক্ষিণ টেক্সাস থেকে সোমবার (১৩ অক্টোবর) পূর্বাঞ্চলীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে এই পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে।
এবার লক্ষ্য চন্দ্রঘাঁটি
স্টারশিপের বিশাল আকার ও জ্বালানি চাহিদার কারণে আর্টেমিস থ্রির রোডম্যাপ অ্যাপোলো মিশনের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। গত শতকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো মিশনে একটি মাত্র রকেট— স্যাটার্ন ভি— উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। সেটার ভেতরেই ছিল ক্রু ক্যাপসুল এবং ল্যান্ডার, যা দিয়ে তারা চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করেন। তবে নাসার এবারের অভিযানে উদ্দেশ্য আরও বেশি হওয়ায় জটিলতা এড়ানোর উপায় নেই।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ed1f7f59411" ) );
অ্যাপোলো মিশনে কেবল চাঁদে মানুষ পাঠিয়েই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিল নাসা। তবে এবার পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহের মাটিতে মার্কিন পতাকা পুঁতেই ক্ষান্ত হতে চায় না তারা। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে সেখানে ঘাঁটি তৈরি করতে, যেখানে অবস্থান করে নভোচারীরা গবেষণা চালাতে পারবেন। তাই, নাসার এখনকার অগ্রাধিকারে রয়েছে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করা, যেখানে ধুলোময় স্তরের নিচে বরফ আকারে পানির মজুত আছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। এই অঞ্চল দুর্গম এবং সেখানে পৌঁছাতে অনেক বেশি জ্বালানি প্রয়োজন। সেখানকার পানি ও অন্যান্য উপাদান আহরণ করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষিত চাঁদের ঘাঁটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।
স্টারশিপের জটিল উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া
স্টারশিপের ওপর নির্ভরশীল না হয়েও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল মনে করছেন অনেকে। নভোযানটির যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংশয় রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম মহাকাশে থাকা অবস্থায় জ্বালানি পুনরায় নেওয়ার কৌশল এবং এ কাজে কতগুলো ট্যাংকার লাগবে, সেটা নির্ধারণ করা।
স্পেসএক্সের এক কর্মকর্তা ২০২৪ সালে ধারণা দিয়েছিলেন, এ অভিযানে ১০টি ট্যাংকার প্রয়োজন হতে পারে। তবে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের প্রকৌশলীরা পরবর্তী সময়ে হিসাব দিয়েছেন, একটি সফল অভিযানের জন্য লাগতে পারে ৪০টিরও বেশি ট্যাংকার।
বর্তমান রোডম্যাপ অনুযায়ী, মিশনটি শুরু হবে একটি 'বেসিক' স্টারশিপ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে, যা জ্বালানি সংরক্ষণাগার বা রিফুয়েলিং ডিপোর ভূমিকা পালন করবে। এটি পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থান করবে, যতক্ষণ না আরও কয়েকটি স্টারশিপ— যেগুলোর কার্গো হিসেবে থাকবে কেবল তরল জ্বালানি— উৎক্ষেপণ হয়ে এসে ডিপোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে জ্বালানি স্থানান্তর সম্পন্ন করে।
এই প্রক্রিয়া খুব দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে, নইলে জ্বালানি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ স্টারশিপে ব্যবহৃত ক্রায়োজেনিক জ্বালানি অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়।
রিফুয়েলিং ডিপো পূর্ণ হলে স্পেসএক্স পরবর্তী ধাপে উৎক্ষেপণ করবে স্টারশিপ এইচএলএস (হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম)—যা মানুষ বহনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এতে থাকবে জীবনধারণের সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। এইচএলএস স্টারশিপটি ডিপোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে জ্বালানি পূর্ণ করার পরই চাঁদের পথে যাত্রা শুরু করবে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ed1f7f5944e" ) );
অন্যদিকে, আলাদা মহাকাশযান ওরিয়ন-এ যাত্রা করবেন নাসার নভোচারীরা, যা উৎক্ষেপিত হবে নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটের মাধ্যমে।উৎক্ষেপণের পর ওরিয়ন রকেট থেকে আলাদা হয়ে চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছাবে এবং সেখানে স্টারশিপ ল্যান্ডারের সঙ্গে যুক্ত হবে। তারপর দুই নভোচারী ওরিয়ন থেকে স্থানান্তরিত হয়ে স্টারশিপ এইচএলএস-এ চড়ে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামবেন।
প্রায় এক সপ্তাহের গবেষণা শেষে তারা আবার এইচএলএস-এ চড়ে চাঁদের কক্ষপথে ফিরবেন এবং অরায়নের সঙ্গে যুক্ত হবেন। এরপর অরায়ন ক্যাপসুল তাদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে, প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে।
নানা মুনির নানা মত
আর্টেমিস প্রকল্প অতি জটিল এবং এক দশকের মধ্যেও বাস্তবায়ন সম্ভব না বলে মন্তব্য করেছেন নাসার সাবেক কর্মকর্তা ডগ লাভেরো। তার মতে, আর্টেমিস থ্রি মিশনের জন্য স্টারশিপকে চন্দ্রযান হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল একটি ভুল পদক্ষেপ।
লাভেরো বলেন, চুক্তি পাওয়ার জন্য ২৯০ কোটি ডলারের প্রস্তাবে কাগজে-কলমে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল স্পেসএক্স। একসময় স্টারশিপ সফলভাবে অভিযান করতে পারলেও চীনের আগে তা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন না তিনি।
এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে স্পেসএক্স কোনও সাড়া দেয়নি।
স্পেসএক্সকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে নাসার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ব্লু অরিজিন। তবে আদালত নাসার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
তবে স্টারশিপ বাছাইকে ভুল মনে করেন না নাসার সাবেক এক কর্মকর্তা। বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ওই ব্যক্তির দাবি, নাসার বিশেষজ্ঞরা একাধিক প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের মাধ্যমে স্টারশিপকে নির্বাচিত করেন। এসব মূল্যায়নে নভোযানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়, কারণ নাসার তহবিল ছিল সীমিত।
তার দাবি, সে সময় নাসার তহবিল ছিল সীমিত। তাই চাইলেও দুইটি কোম্পানিকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
অনেক সমালোচক বলছেন, স্টারশিপকে বেছে নেওয়া হয়েছে মূলত ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কারণে— তাৎক্ষণিক সক্ষমতার জন্য নয়।
সাবেক নাসা প্রশাসক জিম ব্রাইডেনস্টাইন বলেন, যদি লক্ষ্য হয় চীনের আগে চাঁদে পৌঁছানো, তাহলে এই সিদ্ধান্তটা বাস্তবিক অর্থে তেমন যৌক্তিক নয়।
অন্যদিকে, ভারপ্রাপ্ত নাসা প্রধান ডাফি জানিয়েছেন, স্পেসএক্সের প্রতি এখনও তাদের আস্থা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন