দেওবন্দ কেন বাংলাদেশে আরেকজন মাওলানা ভাসানী তৈরি করতে পারছে না?

দেওবন্দ কেন বাংলাদেশে আরেকজন মাওলানা ভাসানী তৈরি করতে পারছে না?

বাংলাদেশে দেওবন্দপন্থি বা কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক যেসব নেতা ইসলামি রাজনীতি করেন, তারা যতটা ‘ইসলামি নেতা’ হয়ে উঠেছেন, ঠিক ততটাই যেন ‘জনতার নেতা’ হয়ে ওঠার অভিলাষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এখানে ‘জনতার নেতা’ বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যেমন সর্বসাধারণের রাজনীতি করতেন, সর্বমতের মানুষের অধিকার আদায়ে যেমন সোচ্চার ছিলেন, তৎপরবর্তী আর কোনও দেওবন্দী আলেম সেই অর্থে জনগণের নেতা হয়ে উঠতে পারেননি।বর্তমানের মাওলানা মামুনুল হক বলেন কিংবা অতীতের মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর, মুফতি ফজলুল হক আমিনী, শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, মরহুম পীরসাহেব চরমোনাই—কেউই আসলে সর্বসাধারণের নেতা হওয়ার চেষ্টা করেননি। তারা মূলত ইসলামি ইস্যুভিত্তিক একটি রাজনৈতিক পাওয়ার গ্রুপ হওয়ার চেষ্টা করেছেন, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, কিন্তু মাওলানা ভাসানীর মতো সর্বসাধারণের নেতা হওয়ার চেষ্টা তাদের মধ্যে বড় একটা দেখা যায়নি।সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘প্রোস্পার আফগানিস্তান’ নামে একটি সাহায্য সংস্থার আমন্ত্রণে আফগানিস্তান সফর করেন। এটি কোনও রাষ্ট্রীয় বা দলীয় সফর ছিল না। তিনি সৌদি আরবে উমরা পালন শেষে প্রোস্পার আফগানিস্তান এনজিও’র উদ্যোগে দুবাই হয়ে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান সফর করেন।তার এই সফর নিয়ে নানা মহলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনেরই প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে আমার মনে ভালো-মন্দের বাইরে ভিন্ন একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে। প্রশ্নটা এমন: মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পর আর কোনও দেওবন্দী আলেম কেন ‘জনগণের নেতা’ হয়ে উঠতে পারলেন না?মাওলানা মামুনুল হকের আফগানিস্তান সফরের সঙ্গে মাওলানা ভাসানী বা ‘জনগণের নেতা’ হয়ে ওঠার কী সম্পর্ক, সেটা বুঝতে হলে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে ১৯৬৩ সালে মাওলানা ভাসানীর চীন সফরে। ১৯৬৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মাওলানা ভাসানী চীন সরকারের আমন্ত্রণে চীনা বিপ্লব দিবস উদযাপন উপলক্ষে সে দেশ সফর করেন। তার এই সফরে তিনি তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাইসহ সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় সাত সপ্তাহের এই সফরে মাওলানা ভাসানী চীনের উন্নয়ন অগ্রগতি স্বচক্ষে দেখে অভিভূত হন। দেশে ফিরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চীনা উন্নয়ন মডেল অ্যাপ্লাই করতে বিশেষভাবে সোচ্চার হন। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই তাকে ‘সমাজতন্ত্রের মৌলানা’ বা ‘রেড মৌলানা’ নামে ট্যাগ করার চেষ্টা করা হয়। মাওলানা ভাসানী অবশ্য তাতে দমে যাননি, তিনি স্বমহিমায় তার হকের রাজনীতি করে গেছেন আমৃত্যু।সেই হিসেবে আমাদের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মাওলানা মামুনুল হকের এই সফরটা কেন রাষ্ট্রীয় সফর হলো না? আফগান সরকারের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে কিংবা বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় তার সফরটা হতে পারতো না? এমনটাই তো হওয়া উচিত ছিল।বাংলাদেশের সঙ্গে আফগানের সম্পর্ক তো নতুন কিছু নয়। এ দেশে ইসলামের আগমন ঘটেছে আফগানদের হাত ধরে। বঙ্গবিজেতা মুসলিম সেনানায়ক আফগান-তুর্ক বংশোদ্ভূত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি ছিলেন আফগানি। এর পরবর্তী আরও কয়েকশ’ বছর আফগানি শাসক, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, সেনা ও ভাগ্যান্বেষীদের বাংলাদেশে উপস্থিতি ছিল বেশুমার। এ দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো দাঁড়িয়েছে আফগানিদের হাতে। বাংলা ভাষায় যে বহু ফারসি শব্দের উপস্থিতি, এই শব্দভাণ্ডার শুধু পারসিয়ানরা আনেনি, এনেছে আফগানিরা। আমাদের দেশের পুরুষের লম্বা পাঞ্জাবি আর ঢোলা সালোয়ারের যে বনেদি পোশাক, এই পোশাকও এসেছে আফগান-পাঠান সংস্কৃতি থেকে। সে হিসেবে আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক স্থাপনে মাওলানা মামুনুল হক অগ্রণী ভূমিকা পালন করলে সেটাকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখার তো তেমন সুযোগ নেই। বঙ্গ-আফগান সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো।সম্প্রতি একটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ভারত-পাকিস্তানসহ আরব বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দিয়েছেন। কিন্তু এখনও সে চিঠির কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মাওলানা মামুনুল হক রাষ্ট্রীয়ভাবে আফগান-বাংলাদেশ ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপনে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি তার ব্যক্তিত্ব কাজে লাগিয়ে অপরাপর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক নানা বোঝাপড়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ ধরনের উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।শুধু ডিপ্লোম্যাটিক উপায়ে যে কাজ সম্ভব হয় না, অনেক সময় ব্যক্তিত্বের পরিচিতিতে সে কাজ সহজেই সমাধা হয়ে যায়।মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যেভাবে জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে চীন সফর করেছিলেন, তার ওপর বর্ষিত সকল অপবাদ মাথা পেতে নিয়েও বাংলাদেশে চীনা উন্নয়ন মডেল অ্যাপ্লাই করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, মাওলানা মামুনুল হককে দেশের মানুষ ওই পর্যায়ের নেতা হিসেবে দেখতে চায়। মাওলানা মামুনুল হক হয়তো মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রবক্তা না, কিন্তু সর্বোপরি তিনি তো ‘সমাজের’ রাজনীতিই করেন। মতাদর্শগতভাবে মাওলানা মামুনুল হক আর ভাসানীর মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দুজনের উদ্দিষ্ট জনতা একই—বাংলাদেশি জনতা। বাংলাদেশি জনগণের ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন তাদের দুজনেরই প্রধান লক্ষ্য। মতাদর্শের ভিন্নতার অজুহাত দিয়ে জনগণের উন্নয়ন-অগ্রগতিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে মাওলানা মামুনুল হক বা দেওবন্দী আলেমদের সরব পদচারণা বিশেষভাবে জরুরি। শুধু সরব না, সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ জরুরি। ইতিহাসের নানা পটপরিবর্তনে দেওবন্দী আলেমগণ যেভাবে নির্ভয়ে ইসলাম ও দেশপ্রেম নিয়ে জনমানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের সেই প্রয়োজনীয়তা ভবিষ্যৎ ইতিহাসেও বারবার ফিরে ফিরে আসবে, আসতেই হবে। কেননা জামায়াতে ইসলামীর যে রাজনীতি এবং ইসলামের যে বয়ান তারা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তা বরাবরই রিস্কি প্রজেক্ট!তাছাড়া, আমাদের সামনে রয়েছে আরব বসন্তের পর মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন সরকারের পতন এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। সেই সম্ভাব্য ভীতিও মনে রাখতে হবে।এসব কারণে বাংলাদেশে মামুনুল হক বা চরমোনাই পীর সাহেবের মতো দেওবন্দী ধারার আলেমদের সর্বোতভাবে উত্থান অতীব জরুরি। জনগণের নেতা হয়ে ওঠার পাশাপাশি ইসলামি রাজনীতির বিকল্প বয়ানও জারি থাকা জরুরি।লেখক: চিন্তক 

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin