মহাষষ্ঠীর মধ্যে দিয়ে আজ থেকে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা।
মণ্ডপে মণ্ডপে বেজে উঠেছে ঢাক ও কাঁসর। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। বাহারি আলোকসজ্জায় আজ থেকে উজ্জ্বল হবে দেবী দুর্গা ও তার চার সন্তান সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক-গণেশ।
এবছর দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসছেন গজে চড়ে। হিন্দু শাস্ত্রমতে এর অর্থ, মর্ত্যলোক ভরে উঠবে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধিতে।
মহাষষ্ঠীর বিষয়ে রাজধানীর রমনা কালী মন্দিরের পুরোহিত হরিচাঁদ চক্রবর্তী জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও সকাল সাতটায় শুরু হয়েছে ষষ্ঠী পূজা হবে। যা শেষ হবে সকাল নয়টার দিকে।
ষষ্ঠী পূজা উপলক্ষে রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের আগমন শুরু হয়েছে। রাতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে।
হিন্দুশাস্ত্র মতে, শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী বাপের বাড়ি বেড়াতে মর্ত্যলোকে আসেন। অসুরশক্তির কাছে পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্র হন দেবতারা। অসুর শক্তির বিনাশে অনুভূত হয় এক মহাশক্তির আবির্ভাব। দেবতাদের তেজোরশ্মি থেকে আবির্ভূত হন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা। আবির্ভূত হওয়ার পর দেবী দুর্গা আসুরিক শক্তিকে বিনাশ করে ত্রিভুবন রক্ষা করেন।
এবছর দেবী দুর্গার বাহন
হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, ভক্তের ডাকে প্রতিবছর মর্ত্যলোকে আসতে ও নিজ বাসস্থান কৈলাসে ফিরে যেতে শক্তির দেবী দুর্গার রয়েছে বিশেষ বাহন।
হিন্দু শাস্ত্রমতে, সপ্তমীর দিন দেবীর আগমন হয় আর দশমীর দিন গমন। সপ্তমী শনিবার বা মঙ্গলবার হলে দেবীর বাহন হয় ঘোটক বা ঘোড়া। সপ্তমী রবিবার বা সোমবার হলে দেবীর বাহন হয় গজ বা হাতি। সপ্তমী বুধবার হলে দেবীর বাহন হয় নৌকা। আর সপ্তমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবী মর্ত্যে আসেন দোলা বা পালকি চড়ে। সেই হিসেবে এবার দেবীর বাহন হবে গজ।
শাস্ত্রমতে, বিজয়া দশমী শনিবার বা মঙ্গলবার হলে দেবীর ফিরে যাওয়ার বাহন ঘোটক বা ঘোড়া। বিজয়া দশমী রবিবার বা সোমবার হলে দেবীর বাহন গজ বা হাতি। বিজয়া দশমী বুধবার হলে দেবীর নৌকা। আর বিজয়া দশমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবী দোলা বা পালকি চড়ে মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে ফিরে যান। সেই হিসেবে এবার দেবীর গমন হবে দোলায় চড়ে।
হিন্দু শাস্ত্রে গজ বা হাতি দেবী দুর্গার উৎকৃষ্টতম বাহন হিসেবে বিবেচিত। ‘গজে চ জলদা দেবী শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা’— অর্থাৎ যদি হাতিতে চড়ে মা দুর্গার আগমন বা গমন হয়, তাহলে কোনও মহামারি, অতিবৃষ্টি কিংবা অনাবৃষ্টি হয় না; মর্ত্যলোক ভরে ওঠে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধিতে। ভক্তদের বিশ্বাস এ বাহনে আগমন বা গমনের মাধ্যমে তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়ারও ইঙ্গিত দেন দেবী দুর্গা।
‘দোলায়াং মড়কং ভবেৎ’, অর্থাৎ দেবী দুর্গা দোলায় বা পালকিতে করে আসা বা যাওয়ার অর্থ- পৃথিবীতে মহামারি বা মড়ক, ভূমিকম্প, খরা, যুদ্ধ, অতিমৃত্যুর শঙ্কা।
সপ্তমী থেকে দশমী কোন পূজা কোন সময়ে
মহালয়া আর মহাপঞ্চমীর পর মহাষষ্ঠীতেও চণ্ডীপাঠ ও চণ্ডীপূজার মাধ্যমে এ বছরের দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এই আয়োজন শেষ হবে বিজয়া দশমীতে মহা-আরতির মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে। পঞ্জিকামতে দুর্গাপূজার বাকি দিনগুলোর সময়সূচি দেখে নেওয়া যাক একনজরে—
মহাসপ্তমী
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মহাসপ্তমী। এ দিন সকালে নবপত্রিকা স্থাপন করা হবে। ‘নবপত্রিকা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ৯টি গাছের পাতা। কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান— এই ৯টি উদ্ভিদকে পাতাসহ একটি কলাগাছের সঙ্গে একত্র করা হয়।
পরে একজোড়া বেলসহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার দেবীপ্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম ‘কলাবউ’।
নবপত্রিকার ৯টি উদ্ভিদ প্রকৃতপক্ষে দেবী দুর্গার ৯টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে বিবেচনা করা হয়। এই ৯ দেবী একত্রে ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে ‘নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমোঃ’ মন্ত্রে পূজিত হন।
নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। দুর্গাপ্রতিমার সামনে একটি দর্পণ বা আয়না রেখে সেই দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিমার প্রতিবিম্বে বিভিন্ন উপচারে দেবীকে স্নান করানো হয়।
মহাষ্টমী
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মহাষ্টমী। অষ্টমী পূজার মূল আকর্ষণ কুমারী পূজা। এদিন ফুল, জল, বেলপাতা, ধূপ-দীপসহ ষোড়শ উপচারে কুমারীরূপে দেবী দুর্গারই আরাধনা করা হয়। ঢাকায় সবচেয়ে বড় পরিসরে কুমারী পূজা হয় রামকৃষ্ণ মিশনে।
মহানবমী
বুধবার (১ অক্টোবর) মহানবমী। এদিন সকালে তর্পণে দুর্গার মহাস্নান হবে, ষোড়শ উপচারে পূজা করা হবে। পুষ্প, অর্ঘ্য নিবেদন শেষে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেবেন ভক্তরা। কোনো কোনো মণ্ডপে নবমীতে যজ্ঞের আয়োজন হয়। মহানবমীতে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতে শুরু করে ভক্তদের হৃদয়।
মহাদশমী
বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) মহাদশমী। এদিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের অসুরিক প্রবৃত্তি, কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেওয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।