উইল ডুরান্ট এবং তার স্ত্রী এরিয়েল ডুরান্টয়ের যৌথভাবে লেখা দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইটি বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়ছিলাম। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বইটি আমার কাছে বেশ সুখপাঠ্য ছিল। বইটি পড়ার মাধ্যমে ইতিহাস থেকে যে শেখার আছে অনেক কিছু, তার আরও কিছু নতুন পাঠ পেয়েছি। আমি কোনও পেশাদার অনুবাদক নই। তবে ইতিহাসের ছাত্র ও গবেষক হিসেবে অনুবাদের চর্চার মধ্যে থাকতে হয়। ইতিহাসের নানা সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ইতিহাসের ন্যারেটিভ তৈরির প্রয়োজনে প্রায়ই এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের প্রয়োজন পড়ে। সেই চর্চার ধারাবাহিকতায় দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইটি অনুবাদের চিন্তা মাথায় আসে। অনুবাদ হোক, সম্পাদনা হোক আর গবেষণা হোক, যদি তা প্রচলিত চর্চার পরিসরে মানসম্মতভাবে হাজির থাকে তাহলে তার পুনরাবৃত্তি আমার কাছে পণ্ডশ্রম মনে হয়। সেই চিন্তার কারণে দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইটির অনুবাদ করার প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে এর একটি বাংলা অনুবাদের খোঁজ করি। ইন্টারনেটের এই যুগে স্বল্প সময়ে তা পেয়েও যাই। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে অন্য খানে।দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইয়ের যে বাংলা অনুবাদ আমার পাঠ করার সুযোগ হয় তার প্রথম বাক্যের সঙ্গে ইংরেজি মূল বইয়ের প্রথম বাক্য মিলাতে গিয়েই প্রথম উছোত খাই। মূল ইংরেজি বইয়ে লেখা হয়েছে: “As his studies come to a close the historian faces the challenge: Of what use have your studies been?” বাংলা অনুবাদক এর বাংলা করেছেন: “ইতিহাসবিদ তার পাঠ ও বিশ্লেষণের অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছালে যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন তা হলো: আপনার গবেষণা কি কোনও কাজে লেগেছে?”অনুবাদের বহুল প্রচলিত দুটি ধারা- আক্ষরিক অনুবাদ অথবা ভাবানুবাদ যাই অনুসরণ করা হোক না কেন, মূল লেখায় লেখক বলেননি এমন কোনও কথা অনুবাদকের নতুন করে যুক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইয়ের বাংলা অনুবাদক সেই কাজটি করেছেন। তিনি “বিশ্লেষণ” শব্দটি বাংলায় যুক্ত করেছেন, যা মূল ইংরেজি বাক্যে লেখকরা বলেননি। দ্বিতীয়ত তিনি “studies” শব্দের অর্থ করেছেন প্রথমে পাঠ এবং পরে গবেষণা। তার “studies” শব্দের পরের অনুবাদ ঠিক থাকলেও প্রথমটি যথার্থ হয়নি। কারণ লেখকদ্বয় উইল এবং এরিয়েল ডুরান্ট উভয় ক্ষেত্রেই “studies”টি গবেষণা অর্থে ব্যবহার করেছেন।সাদাচোখে “studies” শব্দের অর্থ পাঠ এমনটি আমরা জানি। কিন্তু একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকে। অনুবাদককে বাক্যের কখনও কর্তা আবার কখনও বিধেয়কে আবার কখনও উভয়কে আমল নিয়ে বাক্যের অন্য স্বতন্ত্র শব্দ কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা উপলব্ধি করতে হবে, এমনই প্রচলিত অনুবাদের নিয়ম-রীতি। এ ক্ষেত্রে আবার “studies” শব্দের কাছে ফিরে আসা যাক। বিখ্যাত Longman Dictionary of Contemporary English অভিধান মতে, “studies” শব্দের অনেকগুলো অর্থ রয়েছে। এর মধ্যে এই প্রবন্ধে তিনটি অর্থ আলোচনায় এনে নিচের আলোচনায় উপরের বক্তব্যের ন্যায্যতা যাচাই করছি।ইংরেজি লংম্যান অভিধান মতে, “studies” শব্দের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অর্থ ১) to learn about a subject at school, university etc., ২) to try to find out more about a subject or problem using scientific methods, ৩) to look at something carefully.উইলিয়ান ও এরিয়েল ডুরান্টয়ের লেখা দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইয়ের উপযুক্ত বাক্যে “studies” শব্দের অর্থ to try to find out more about a subject or problem using scientific methods অর্থ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলায় স্বল্পস্বরে বলা যায় “গবেষণা”। যদিও এখানে রিসার্স (research) শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। কিন্তু যেহেতু সান্টিফিক মেথডের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান (আবিষ্কার করা) খোঁজার কথা বলা হয়েছে, সেহেতু এটি গবেষণাই হবে। প্রশ্ন হতে পারে “studies” শব্দের অন্য দুটি অর্থ রেখে কেন আমি দ্বিতীয় অর্থটি বেছে নিয়েছি। তার কারণ হচ্ছে এই বাক্যের সাবজেক্ট বা কর্তা the historian বা ইতিহাসবিদ। একজন ইতিহাসবিদের কাজ কোনও বিষয়কে সাধারণভাবে পাঠ করা বা সতর্কতার সাথে পাঠ করা নয়। তার কাজ গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাস নির্মাণ করা। কিন্তু এই বাক্যে সাবজেক্ট বা কর্তা হিসেবে ছাত্র বা শিক্ষক থাকতেন তাহলে সাবজেক্ট বা কর্তার চরিত্র বিচারে “studies” শব্দের অর্থেরও বদল হতো। সাবজেক্ট বা কর্তা ছাত্র হলে “studies” শব্দের অর্থ to learn about a subject at school, university etc. যথার্থ হতো। কারণ ছাত্রের কাজই হচ্ছে পাঠের মাধ্যমে শেখা। একইভাবে সাবজেক্ট বা কর্তা যদি শিক্ষক হতেন তাহলে অর্থ to look at something carefully। কারণ একজন শিক্ষক ছাত্রের মতো সাধারণভাবে পাঠ করেন না। তাকে অন্যকে শেখাতে হয় বলে যেকোনও বিষয়কে তিনি সতর্কতার সঙ্গে গভীর মনোযোগে পাঠ করেন।অবশ্যই এই প্রশ্নও সাধারণ চোখে যে কেউ তুলতে পারেন একজন শিক্ষক বা ছাত্র কি গবেষণা করেন না? সাধারণ চোখে মনে হতে পারে শিক্ষক বা ছাত্র গবেষণা করেন। কিন্তু যখন তিনি গবেষণা করেন তখন শিক্ষক ছাত্রের পাশাপাশি তার গবেষক পরিচয়ও যুক্ত হয়। আরও পরিষ্কারভাবে বললে তিনি তখন আর সাধারণ শিক্ষক বা ছাত্র পরিচয়ে আবদ্ধ থাকেন না, বিষয় বিবেচনায় ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হন।দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইয়ের হিউম্যান ট্রান্সলেটর বা মনুষ্য অনুবাদকের এই ক্ষেত্রের ভ্রান্তি নিয়ে আলাপ আর না বাড়িয়ে প্রযুক্তির এই যুগে যন্ত্রের অনুবাদ পরীক্ষা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত গুগল ট্রান্সলেটর ও এআইয়ের ধার এবার পরীক্ষা করা যাক। এই প্রবন্ধে আলোচ্য দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইয়ের উপযুক্ত বাক্য এআইয়ের চ্যাটজিটিপি অনুবাদ করেছে “তার পড়াশোনা যখন শেষের দিকে, তখন ইতিহাসবিদ একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন: ‘তোমার পড়াশোনার উপকারিতা কী?”চ্যাটজিটিপির অনুবাদ যথার্থ হয়নি কারণ আগেই বলা হয়েছে ঐতিহাসিক ছাত্রের মতো পড়াশোনা করেন না। ঐতিহাসিক গবেষণার জন্য পড়েন বা গবেষণা করেন সেই কারণে এখানে চ্যাটজিটিপির “studies” শব্দের অর্থ পড়াশোনা যথার্থ হয়নি।এবার আসা যাক গুগল ট্যান্সলেটরের অনুবাদে। গুগল ট্রান্সলেটর দ্য লেসন্স অব হিস্ট্রি বইয়ের উপযুক্ত বাক্যর অনুবাদ করেছে: ‘তার পড়াশোনা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ইতিহাসবিদ এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন: আপনার পড়াশোনা কী কাজে লেগেছে?’গুগল ট্যান্সলেটরও উপযুক্ত বাক্যের প্রকৃত অর্থ ধরতে পারেনি। “studies” শব্দের অর্থ গুগল ট্রান্সলেটর পড়াশোনা করেছে। প্রকৃতপক্ষে উপযুক্ত বাক্যের “studies” শব্দের অর্থ হবে পড়াশোনা নয়, গবেষণা।এক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে যে মনুষ্য অনুবাদকের মতোই যন্ত্রের অনুবাদে ভ্রান্তি লক্ষ করা যাচ্ছে।যন্ত্রের অনুবাদের দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, গুগল ট্রান্সলেটর বা এআই উভয়ই অনুবাদের সময়ে নামবাচক শব্দ বুঝতে এখনও অক্ষম। যেমন: “সমুদ্র আমার বন্ধু।” এই বাক্যের সমুদ্র কি কোনও ব্যক্তির নাম নাকি সাগর অর্থে উপযুক্ত বাক্যে ব্যবহৃত হয়েছে সেই বিষয়টি বুঝতে পারেনি, সেই কারণে গুগল ট্রান্সলেটর উপরের বাক্যের অনুবাদ করেছে: “The sea is my friend.”গুগল ট্রান্সলেটরের মতো চ্যাটজিটিপিও একই অনুবাদ করেছে: “The sea is my friend.” কিন্তু উভয়ের অনুবাদই ভ্রান্ত। কারণ উপরের বাক্যে আমি কোনও সমুদ্র বা সাগরের কথা বলিনি, মূলত আমার ছোটবেলার সহপাঠী সমুদ্রের কথা বলেছি। এক্ষেত্রে সমুদ্র ব্যক্তির নাম হিসেবে বাংলা ও ইংরেজি উভয় অনুবাদে অপরিবর্তিত থাকবে।এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে, যার থেকে এই বিষয়টি স্পষ্ট হবে যে মনুষ্য অনুবাদকের মতো এআইয়ের বা গুগল ট্রান্সলেটরের অনুবাদ ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়।বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে যে গণমাধ্যমসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই মনুষ্য অনুবাদকের বদলে যন্ত্রের অনুবাদের ওপর নির্ভর করছে। ফলে ভুলভ্রান্তির সংখ্যা বাড়ছে। যথার্থ অনুবাদের জন্য মনুষ্য অনুবাদকের মতোই গুগল বা চ্যাটজিটিপির মাধ্যমে অনুবাদ করার পর একজন মানুষ দ্বারা তা পুনরায় সম্পাদনা করা প্রয়োজন, চেক-রিচেক করা দরকার। প্রকৃতপক্ষে, যন্ত্রের বিকাশ ঘটার পরও অনুবাদ কাজে মানুষের প্রয়োজন একেবারে ফুরিয়ে যাবে না। যথার্থ অনুবাদের জন্য গুগল বা ওপেন এআইয়ের যুগেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও বিকাশের জন্য মানুষকে নতুন নতুন ভাষা রপ্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে মানুষের কাজের ধরন বদলাবে। আগে মানুষকে প্রথমে অনুবাদ করতে হতো, পরে ওই অনুবাদের উপযুক্ততা যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনার প্রয়োজন পড়তো। কিন্তু এখন মানুষের সহযোগী হিসেবে যন্ত্র প্রথম ধাপের কাজ করে দেবে। প্রাথমিক অনুবাদের খসড়া যন্ত্রের কাছ থেকে পাওয়া যাবে। এরপর তা পলিশ করার দায়িত্ব অবশ্যই মানুষকে পালন করতে হবে। যন্ত্রের ওপর শতভাগ নির্ভর করা যাবে না। যন্ত্রের উন্নতির সাথে সাথে ভবিষ্যতে গুগল ট্রান্সলেটর বা চ্যাটজিটিপির ভুলের সংখ্যা কমবে।তখন তারা অনেক শব্দের ক্ষেত্রে হয়তো মানুষের কাছে পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চাইবে, তুমি কী সমুদ্র বলতে সাগর বুঝিয়েছো নাকি তোমার বন্ধুর নাম সমুদ্র। তখন হয়তো তাদের পক্ষে আরও বেশি নিখুঁত অনুবাদ করা সম্ভব হবে। কিন্তু তারপরও মানুষের প্রয়োজন পড়বে। কারণ ওই যন্ত্রের উত্তরগুলো মানুষকেই দিতে হবে অথবা যন্ত্র পরিচালনার দায়িত্ব তখনও মানুষকে পালন করতে হবে। সুতরাং অনুবাদক হিসেবে মানুষের প্রয়োজন কখনোই ফুরাবে না।যন্ত্রের যতই উন্নতি হোক না কেন অনুবাদ বিষয়ক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যন্ত্র নয়, মানুষই নেবে। তাই তার সব সময় মূল ও অনুবাদিত ভাষায় জ্ঞান থাকতে হবে। সারকথা হচ্ছে, এআইয়ের যুগেও অনুবাদ সংশ্লিষ্ট কাজে মানুষের গুরুত্ব একটুও লোপ পাবে না। বরং মানুষকে যন্ত্রের সঙ্গে চলতে গিয়ে যন্ত্রকে তার কাজের সহযোগিতা হিসেবে ব্যবহার করতে আরও বেশি দক্ষ ও জ্ঞানী হতে হবে। এক কথায়, মানুষকে টিকে থাকতে যন্ত্রের চেয়েও বেশি দক্ষ ও জ্ঞানী হতে হবে। যন্ত্রের কার্যকারিতা যত উন্নতি হতে থাকবে চালর্স ডারইউনের “Survival of the fittest” মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তব সত্যরূপে ধরা দেবে। ওপেন এআইয়ের আগামী বিশ্ব হবে যন্ত্রের চেয়েও দক্ষ ও জ্ঞানী মানুষের।লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]