ফুসফুসের স্বাভাবিক কোষগুলো হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, তখন সেখানে টিউমার তৈরি হয়। এই টিউমার ছড়িয়ে পড়ে শরীরের অন্য অংশে গেলে সেটিই ফুসফুস ক্যানসার হিসেবে পরিচিত। ফুসফুসের ক্যানসারের প্রধান কারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান।
অনলাইন আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তন্নিমা অধিকারী। গত বুধবার এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক এই অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। নাসিহা তাহসিনের উপস্থাপনায় এতে অতিথি হিসেবে ছিলেন ডা. তন্নিমা অধিকারী।
আলোচনায় ডা. তন্নিমা অধিকারী বাংলাদেশে ফুসফুস ক্যানসারের বর্তমান পরিস্থিতি, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা, প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে পরামর্শ দেন। পর্বটি সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো ডটকম এবং প্রথম আলো, এসকেএফ অনকোলজি ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থাপক নাসিহা তাহসিন জানান, এক থেকে দেড় শ বছর আগেও বিশ্বব্যাপী ফুসফুসের ক্যানসার ছিল একটি বিরল রোগ। কিন্তু ১৮৭৭ সালে জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, যত মানুষ ক্যানসারে মারা যেতেন তাঁদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন মাত্র ১ শতাংশ। তারপর ১৯২০ থেকে ১৯৩০-এর দিকে এ রোগটি দ্রুত বাড়তে থাকে। এর পেছনে রয়েছে এক ভয়ংকর ইতিহাস। সে সময় সিগারেটের মেশিন আবিষ্কার হয়, যা দিয়ে দিনে হাজার হাজার সিগারেট উৎপাদন করা হতো। বিশ্বযুদ্ধের পর হওয়ায় সবার মধ্যে বিষণ্নতা ও হতাশা বৃদ্ধি হতে থাকে। আর এটি কমানোর অন্যতম উপায় মনে করে ধূমপান করা হতো।
ফুসফুসের ক্যানসার কেন হয়
এ ধরনের ক্যানসার কেন হয়, উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. তন্নিমা অধিকারী বলেন, ‘ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ সরাসরি ও পরোক্ষ ধূমপান। ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী এই ধূমপান। কারণ, একটা সিগারেটে ১০০টি “নন–কারসিনোজেন” থাকে। এ ছাড়া কিছু গ্যাস আছে, যেমন অ্যাসবেস্টস ও রেডন, এগুলো আমাদের গ্রামে মাটির যে ঘরগুলো থাকে সেই বদ্ধ ঘরের মধ্যে উৎপন্ন হয়।’
ডা. তন্নিমা অধিকারী বলেন, যাঁরা আর্সেনিকযুক্ত পানি খাচ্ছেন তাঁদেরও ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে। যাঁরা কয়লার খনি বা পেট্রোলিয়ামের কারখানায় কাজ করেন বা বিল্ডিং নির্মাণে কাজ করেন তাঁদের ফুসফুস ক্যানসার হতে পারে। আরেকটি কারণের মধ্যে আছে, যদি কেউ ছোটবেলায় বুকে রেডিওথেরাপি নেন এবং সেই রেডিয়েশন যদি ফুসফুসে পড়ে, তাঁর পরবর্তী সময়ে ফুসফুস ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাসও এ ক্যানসারের জন্য দায়ী।
বেশি আক্রান্ত হয় পুরুষেরা
বাংলাদেশে ফুসফুস ক্যানসারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডা. তন্নিমা অধিকারী বলেন, গ্লোবোক্যানের ২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হন। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার পুরুষ এবং ৩ হাজার নারী। পুরুষদের মধ্যে বেশি হওয়ার কারণ হলো ধূমপানের উচ্চহার। পুরুষদের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার, নারীদের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে।
এই ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ কী
ফুসফুস ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে ডা. তন্নিমা অধিকারী বলেন, দীর্ঘদিন মানে তিন সপ্তাহের বেশি খুসখুসে কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, গলার স্বর ভেঙে যাওয়া, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি হলো ফুসফুস ক্যানসারের লক্ষণ। তবে এটি দেহের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে অঙ্গভেদে মাথাব্যথা, হাড়ে ব্যথা, লিভারে সমস্যা ইত্যাদি দেখা দেয়। এর যেকোনো একটি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকিৎসা কী
ফুসফুস ক্যানসার নিশ্চিতে বিদ্যমান পরীক্ষার কথা বলেন ডা. তন্নিমা অধিকারী। তিনি বলেন, বুকের এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, ব্রঙ্কোস্কপি, বায়োপসি বা স্পুটাম সাইটোলজি করা হয়। উন্নত ক্ষেত্রে পেট-সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও রক্ত পরীক্ষারও প্রয়োজন হয়।
ফুসফুস ক্যানসারের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে ডা. তন্নিমা অধিকারী বলেন, এর চিকিৎসা নির্ভর করে রোগ কোন পর্যায়ে শনাক্ত হয়েছে তার ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে সার্জারির মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা সম্ভব। পাশাপাশি কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর আধুনিক চিকিৎসায় টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি যুক্ত হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে রোগীর আয়ু বাড়াতে সহায়তা করছে। সবার জন্য বলতে চাই, বাংলাদেশেও এখন এসব চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে।
ফুসফুস ক্যানসার থেকে কীভাবে বাঁচতে পারি? উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. তন্নিমা অধিকারী বলেন, যেহেতু ফুসফুস ক্যানসারের প্রধান কারণ ধূমপান, তাই এ অভ্যাস ত্যাগ করা সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্য পরিহার, দূষণ থেকে সুরক্ষায় মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্য গ্রহণ ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—সবই এ রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে আশা বেশি
এ ধরনের ক্যানসারে বেঁচে থাকার হার সম্পর্কে ডা. তন্নিমা অধিকারী বলেন, যদি রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হয়, তাহলে পাঁচ বছরের সারভাইভাল রেট প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু রোগ অ্যাডভান্সড পর্যায়ে গেলে চিকিৎসা জটিল হয় এবং বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জরুরি।