গাজায় বলপ্রয়োগে শান্তি স্থাপনে কেউ যুক্ত হতে চাইবে না: জর্ডানের রাজা

গাজায় বলপ্রয়োগে শান্তি স্থাপনে কেউ যুক্ত হতে চাইবে না: জর্ডানের রাজা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী সেখানে মোতায়েন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বলেছেন, যদি শান্তিরক্ষা নয়, বরং শান্তি স্থাপনে বল প্রয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে কোনও দেশই এতে অংশ নিতে চাইবে না।

রবিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজা আবদুল্লাহ বলেন, গাজার ভেতরে নিরাপত্তা বাহিনীর ম্যান্ডেট কী হবে, এটাই মূল প্রশ্ন। যদি তা শান্তিরক্ষা হয়, তাহলে সেটি সম্ভব। কিন্তু যদি তা বলপ্রয়োগে শান্তি স্থাপনের বিষয় হয়, কেউই সে দায় নিতে চাইবে না।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, শান্তিরক্ষা মানে হলো স্থানীয় পুলিশ ও ফিলিস্তিনি প্রশাসনকে সহায়তা করা, এতে জর্ডান ও মিসর প্রশিক্ষণ দিতে রাজি। কিন্তু এটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। রাজা বলেন, যদি আমরা গাজায় অস্ত্র নিয়ে টহল দিতে যাই তাহলে সেটি এমন এক পরিস্থিতি হবে, যাতে কোনও দেশই জড়াতে চাইবে না।

জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পক্ষগুলো সম্মত থাকে, আর শান্তি প্রয়োগ মানে হলো সামরিক শক্তি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ আরোপ। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, গাজায় এমন বাহিনী মোতায়েন করা হলে তারা হামাস-ইসরায়েল সংঘাতের নতুন ধাপে জড়িয়ে পড়তে পারে।

ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরব দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের গাজায় স্থিতিশীলতা বাহিনী পাঠিয়ে ফিলিস্তিনি পুলিশকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে মিসর ও জর্ডানের পরামর্শ নেওয়ার কথাও আছে। এর শর্ত অনুযায়ী, হামাসকে নিরস্ত্র হয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে হবে।

তবে হামাস এখনও অস্ত্র জমা দেয়নি। বরং তারা কয়েক হাজার যোদ্ধা মোতায়েন করেছে গাজার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখলের জন্য। ইসরায়েলও বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছে, আর ফিলিস্তিনি অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও গাজার কিছু অংশে সক্রিয় বলে জানা গেছে।

রাজা আবদুল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, জর্ডান গাজায় সেনা পাঠাবে না।

জর্ডানের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এবং দেশটি ২৩ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে।

হামাসের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাজা বলেন, আমি তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে যারা তাদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা কাতার ও মিসর আশাবাদী যে হামাস প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।

রাজা সতর্ক করে বলেন, যদি আমরা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধান না করি, আরব-মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত থাকবে, তাহলে আমরা সবাই ধ্বংসের দিকে যাব।

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় যুদ্ধকালীন মধ্যস্থতার মূল ভূমিকা পালন করছে কাতার ও মিসর। অন্যদিকে জর্ডান মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। রাজা নিজে গাজার আকাশসীমায় তিনবার ত্রাণ সরবরাহ মিশনে অংশ নেন। তিনি বলেন, পেছন থেকে যখন ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য দেখছিলাম, তা ছিল ভয়াবহ। আমরা আন্তর্জাতিকভাবে কীভাবে এমন ধ্বংস হতে দিচ্ছি, তা ভাবলেই অবাক লাগে।

ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে রাজা আবদুল্লাহ গাজা থেকে দুই হাজার অসুস্থ শিশুকে সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি চান। ট্রাম্প তখন একে চমৎকার মানবিক উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেন। এরই মধ্যে ২৫৩ শিশু জর্ডানে স্থানান্তরিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এখনও গাজার প্রায় ১৫ হাজার বাসিন্দা সরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জর্ডানের রানি রানিয়া গাজার চলমান যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, গত দুই বছর ধরে এক মা হিসেবে দেখেছি, শিশুরা কাঁপছে, অনাহারে আছে, ভয় পাচ্ছে, আর আমরা কিছুই করতে পারছি না। পুরো পৃথিবী দেখছে, তবু কিছু করছে না।

ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রশংসা করে বলেন, তার কৃতিত্বের জায়গা হলো, তিনিই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ইসরায়েলের ওপর বাস্তবিক চাপ প্রয়োগ করেছেন। আগের প্রেসিডেন্টরা কেবল সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকতেন।

রানি আশা প্রকাশ করেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে স্থায়ী শান্তি সম্ভব, যদিও বর্তমানে শত্রুতার মাত্রা তীব্র। তার ভাষায়, এখন আশা রাখা সহজ নয়, কিন্তু সেটাই একমাত্র পথ যা আমাদের মানবতাকে বাঁচায়।

গাজায় যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর। ওই হামলায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নেওয়া হয়। জবাবে গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ইসরায়েলের অভিযানে ৬৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল? BanglaTribune | মধ্যপ্রাচ্য

যেভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দাফন করছে ইসরায়েল?

ইসরায়েলি দখলকৃত পশ্চিম তীরে এখন বসবাস করছেন প্রায় ২৭ লাখ ফিলিস্তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এ ভূখণ্ডকে ভবিষ্...

Sep 22, 2025

More from this User

View all posts by admin