গুগল সার্চে ভুয়া পর্নো ও জুয়ার লিংকের ফাঁদ

গুগল সার্চে ভুয়া পর্নো ও জুয়ার লিংকের ফাঁদ

ধরুন, আপনি গুগলে নিজের নাম লিখে সার্চ দিলেন। দেখলেন, আপনার নামে ছড়ানো রয়েছে পর্নোগ্রাফিক ভিডিওর অসংখ্য লিংক। সেগুলো হোস্ট করা হয়েছে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়, বহুজাতিক কোম্পানি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। লিংকে ক্লিক করলেই নিয়ে যাচ্ছে পর্নো বা জুয়ার সাইটে। ভারতের আসাম রাজ্যের এক নারী ঠিক এমন ঘটনার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশেও কাছাকাছি ঘটনার শিকার হয়েছেন কয়েকজন। এসব ঘটনায় সাইবার অপরাধের পাশাপাশি গুগলের নিজস্ব নীতিমালাও লঙ্ঘন করা হয়েছে।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের ‘ফার্স্ট হ্যারাসড বাই আ ডিপফেক দেন বাই পর্নো লিংকস ডমিনেটিং সার্চ রেজাল্টস’শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়, আয়ের জন্য প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের নীতিমালা লঙ্ঘন করে ডিপফেকের মাধ্যমে এমন ভুয়া লিংক ছড়িয়ে পড়ছে। এটি মানুষকে অনলাইনে হয়রানিতে ফেলছে।

ডিপফেক হলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করা।

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামের ওই তরুণী তাঁর সাবেক প্রেমিকের হাতে ডিপফেকের শিকার হন। ওই তরুণীর নামে তৈরি করা হয় ভুয়া অশ্লীল কনটেন্ট। পুলিশের ভাষ্য, ইনস্টাগ্রামে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে ওই ভুয়া ভিডিও পোস্ট করে অভিযুক্ত সাবেক প্রেমিক প্রায় ১০ লাখ রুপি আয় করেছেন।

ডিসমিসল্যাব গত জুলাইয়ে ওই তরুণীর নাম গুগলে সার্চ করে দেখেছে, মোট ১০৯টি ফলাফলের মধ্যে ৫৯টিই ছিল স্প্যাম পেজ। এর ৫৪ শতাংশই পর্নোগ্রাফি-সংশ্লিষ্ট ক্লিকবেইট, যা ব্যবহারকারীকে নিয়ে যাচ্ছিল পর্নো বা জুয়ার ওয়েবসাইটে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব লিংক হোস্ট করা হয়েছে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, নিউইয়র্ক সিটির সরকারি ডোমেইন, ডেল, মাইক্রোসফট, কলাম্বিয়া ও এমআইটির মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সাইটে।

ক্লিকবেইট হলো চটকদার শিরোনাম, ছবি বা লিংকের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং তাঁদের কোনো নিবন্ধ, ছবি বা ভিডিওতে ক্লিক করতে প্রলুব্ধ করা, যা প্রায়ই প্রতারণামূলক ও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

আসামের ওই তরুণী একমাত্র উদাহরণ নন। ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, যেসব মানুষ অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাঁদের অনেকের নাম লিখে সার্চ করলেও একই ধরনের লিংক পাওয়া যায়। সেসবও বিশ্বস্ত ডোমেইনে হোস্ট করা থাকে।

আইএমডিবি, রেডিট, সাউন্ড ক্লাউড ও লিংকডইনের মতো প্ল্যাটফর্মেও ভুয়া পোস্টের মাধ্যমে একই ধরনের কনটেন্ট ছড়ানো হয়। এসব লিংক আসলে বহিরাগত (ইনজেক্টেড) ওয়েবপেজ, যেখানে সুপরিচিত ডোমেইনের ভেতরে নকল বা স্প্যাম কনটেন্ট রাখা হয়।

প্রতিবেদনটি করতে গিয়ে ডোমেইনে লিংক হোস্ট হওয়া চারটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ডিসমিসল্যাব।

ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ বলছে, সাইবার অপরাধীরা ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এসব ডোমেইনে ভুয়া বা ইনজেক্টেড ওয়েবপেজ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এসব পেজকে বলা হয় ‘ডোরওয়ে পেজ’। ব্যবহারকারী যখন এতে ক্লিক করেন, তখন তাঁকে রিডিরেক্ট করে নিয়ে যাওয়া হয় জুয়া বা পর্নোগ্রাফি সাইটে। অনেক ক্ষেত্রে এসব লিংকে পর্নোগ্রাফিক থাম্বনেইল ব্যবহার করা হয়।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আশরাফুল হক ডিসমিসল্যাবকে বলেন, এগুলো সাইটে অননুমোদিতভাবে ঢোকানো ক্ষতিকর লিংক। বৈধ ডোমেইনের আড়ালে স্প্যামাররা কনটেন্ট লুকিয়ে ফেলে, যা ব্যবহারকারীদের প্রতারিত করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের (এসইও) অপব্যবহার করে কোনো ওয়েবসাইট বা এ ধরনের কনটেন্টকে সার্চ ইঞ্জিনে (গুগল) ওপরে আনা হয়েছে। সুপরিচিত ডোমেইনে এ ধরনের লিংক হোস্ট করার মানে হচ্ছে, তাদের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোতে দুর্বলতা আছে।

ডিসমিসল্যাব বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এসব চিহ্নিত ভিডিও লিংকে আসল কনটেন্ট থাকে না। এসব লিংক ব্যবহারকারীদের অন্য পর্নোগ্রাফি বা জুয়ার ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। যেমন এমআইটির ডোমেইনের একটি পেজে আসামের ওই তরুণীর ভাইরাল ভিডিওর কথা লেখা থাকলেও তা ক্লিক করলে রিডিরেক্ট হয়ে একটি জুয়ার সাইটে নিয়ে যায়।

এ ধরনের লিংকগুলো বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব বলেছে, এভাবে রিডিরেক্ট চেইন ব্যবহার করে অর্থ আয় করা হচ্ছে।

শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশেও ঘটেছে এ ধরনের প্রতারণা। ডিসমিসল্যাব প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত জুলাইয়ে ঢাকার দুজন কোচিং শিক্ষকের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। তাঁদের মধ্যে একজন নারী শিক্ষকের নাম গুগলে সার্চ করলে প্রথমেই আসে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের ডোমেইনে হোস্ট করা পর্নো-সংক্রান্ত লিংক।

একইভাবে চলতি বছরের জুনে কুমিল্লার মুরাদনগরে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। সে সময় তাঁকে নিপীড়নের একটি ভিডিও অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ২৯ জুন হাইকোর্ট সব প্ল্যাটফর্ম থেকে ভুক্তভোগীর ওই ভিডিও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরানোর নির্দেশ দেন।

তবে এরপরও ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কী-ওয়ার্ড দিয়ে গুগলে সার্চ করলে পর্নো সাইটের লিংক ভেসে ওঠে।

২০২৪ সালের মার্চে গুগল ‘সাইট রেপুটেশন এবিউজ পলিসি’ চালু করে, যা ওই বছরের মে মাস থেকে কার্যকর হয়। নীতি অনুযায়ী, কোনো সাইটের অংশ যদি মূল কনটেন্টের সঙ্গে একেবারেই বেমানান হয়, তবে ব্যবস্থা নিয়ে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে এসব পেজ সরাতে সময় নিচ্ছে গুগল, আর কনটেন্ট সরালেও সার্চ ফলাফলের তালিকা থেকে লিংক মুছতে দেরি হচ্ছে।

এদিকে আসামের ওই তরুণীর ঘটনায় অভিযুক্ত প্রেমিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর নামে খোলা ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবু ওই তরুণীর নাম সার্চ দিলে এখনো পর্নোগ্রাফির লিংক ভেসে আসে।

গত বছরের জুলাইয়ে প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ওয়্যারডে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত ‘গার্লসডুপর্ন’ মামলার ভুক্তভোগীরা এক বৈঠকে গুগলকে সার্চ থেকে তাঁদের আপত্তিকর ভিডিও লিংক স্থায়ীভাবে সরাতে অনুরোধ করেছিলেন। এতে কিছুটা উন্নতি হলেও তাঁদের অধিকাংশ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি। এ কারণে ভুক্তভোগীদের নাম সার্চ দিলে ওই কনটেন্ট বারবার ফিরে আসছে।

এ ধরনের ঘটনায় গুগলের একাধিক নীতির লঙ্ঘন হয়েছে। এর মধ্যে সাইট রেপুটেশন এবিউজ পলিসি উপেক্ষা, ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রদর্শন, ভুক্তভোগীর অনুমতি ছাড়া অশ্লীল কনটেন্ট প্রচার, অনুপযুক্ত কনটেন্ট ফিল্টারে ব্যর্থতাসহ আদালতের নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা উল্লেখযোগ্য।

এ বিষয়ে গুগলের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তাদের মুখপাত্র ই-মেইলে জানিয়েছে, ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকানো তাদের অগ্রাধিকার, তবে নীতিমালা অনুযায়ী বা আদালতের আদেশেই লিংক সরানো হয়। সার্চের ক্ষেত্রে বিকল্প ফলাফল না থাকলে ক্ষতিকর লিংক ভেসে উঠতে পারে, আর অনুরোধ পেলে সিস্টেম তা শিখে পদক্ষেপ নেয়। আদালতের নির্দেশ পেলে দল দ্রুত তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেয়। এ ছাড়া তাদের নিজস্ব নীতি কার্যকর করতে গুগল স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও মানব টিম একসঙ্গে কাজ করে। জটিল বিষয় হলে বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হয়। সরানোর ব্যাপারটি নির্ভর করে কনটেন্টের ধরন ও প্রক্রিয়ার ওপর।

ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এটি সাধারণ কোনো প্রতারণা বা জালিয়াতির ঘটনা নয়। এ ধরনের ঘটনা ভুক্তভোগীর ব‍্যক্তিজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ভুক্তভোগীদের ট্রমা বা মানসিক পীড়ার অভিজ্ঞতার মধ‍্য দিয়ে যেতে হয়। এর পদ্ধতিগত সমাধানের পথ গুগলকেই বের করতে হবে।

(প্রথম আলোর নীতিমালা অনুযায়ী এই প্রতিবেদনে আসামের ওই তরুণীর নাম উল্লেখ করা হয়নি।)

Comments

0 total

Be the first to comment.

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে Prothomalo | বাংলাদেশ

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারপতির মধ্যে ৪ বিচারপতির বিষয়ে...

Sep 13, 2025
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক Prothomalo | বাংলাদেশ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য...

Sep 12, 2025
দুর্গাপূজা যাতে শান্তিপূর্ণ না হতে পারে, সে জন্যই খাগড়াছড়ির ঘটনা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা Prothomalo | বাংলাদেশ

দুর্গাপূজা যাতে শান্তিপূর্ণ না হতে পারে, সে জন্যই খাগড়াছড়ির ঘটনা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

শারদীয় দুর্গাপূজা যেন শান্তিপূর্ণভাবে না হতে পারে, সে জন্যই খাগড়াছড়িতে ‘সহিংস ঘটনা ঘটানো’ হয়েছে বলে...

Oct 01, 2025

More from this User

View all posts by admin