অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হলেও ঢাকার অভিজাত ব্যবসাকেন্দ্র গুলশান-২ নম্বরের গুলশান মার্কেটে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এখনও তা মানছে না। মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের (ভ্যাট গোয়েন্দা) সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে— মার্কেটের ৪৪টি দোকানের মধ্যে মাত্র তিনটি অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করেছে। বাকি ৪১টির মধ্যে অনেকে নিবন্ধিত হলেও রিটার্ন দাখিলের নিয়ম মানছে না।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এই অনুসন্ধানের তথ্য সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, গুলশান মার্কেটে ইলেকট্রনিকস, রেস্টুরেন্ট, স্যানেটারি, ওষুধ, মিষ্টি, টায়ার, ক্যামেরা ও বিউটি সেলুনসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা চলছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান হয় নিবন্ধন নেয়নি, নয়তো নিবন্ধন নিয়েও নিয়মিত ভ্যাট জমা দিচ্ছে না— অথচ ক্রেতাদের কাছ থেকে নিয়মিত ভ্যাট আদায় করছে তারা। ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ভ্যাট ফাঁকিতে অনলাইনের চেয়ে অফলাইনে আগ্রহ বেশি
ভ্যাট গোয়েন্দাদের ধারণা, ব্যবসায়ীরা অনলাইন রিটার্নকে এড়িয়ে অফলাইন বা ম্যানুয়াল উপায়ে কাজ চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন, যাতে ভ্যাট পরিশোধের সঠিক হিসাব গোপন রাখা যায়। এ অবস্থায় এনবিআরের কর আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
২০১৯ সালের এক নির্দেশনায় এনবিআর জানিয়েছিল, শপিং মলে অবস্থিত সব প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হবে। কিন্তু গুলশান মার্কেটের অনুসন্ধান দেখায়— নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনীহা স্পষ্ট। ফলে পণ্যের দামে অন্তর্ভুক্ত ভ্যাট সরকারী কোষাগারে জমা না হওয়ায় রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, একইসঙ্গে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ছোট উদ্যোক্তারা জানেন না ই-রিটার্ন কীভাবে দিতে হয়। তারা বলছেন, ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের উদ্যোগগুলো ধারাবাহিক নয়। কখনও ইসিআর, কখনও ইএফডি মেশিন চালু করা হলেও কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। ছোট ব্যবসায়ীরা, বিশেষত যারা স্বল্পশিক্ষিত, তারা ই-রিটার্ন প্রক্রিয়া বুঝতে পারেন না— ফলে তা দাখিলেও আগ্রহী নন।
জানা গেছে, সারা দেশে প্রায় এক কোটি দোকান রয়েছে, অথচ ভ্যাট নিবন্ধন পেয়েছে মাত্র পাঁচ লাখ।
ভ্যাট গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা
ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতরের অনুসন্ধানকারী দলটি চলতি বছরের ২ জুলাই গুলশান মার্কেটে জরিপ চালায়। এটি কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকার (উত্তর) আওতাধীন এলাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত মূসকের আওতায় এনে প্রকৃত করদায়িত্ব নির্ধারণ করা গেলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
তারা পরামর্শ দিয়েছেন— সারা দেশে এমন মার্কেটভিত্তিক অভিযান চালিয়ে ভ্যাটযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে এবং অনলাইন রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে হবে।
এনবিআর বলছে, সংগৃহীত ভ্যাট সরকারে না পৌঁছানোই বড় সমস্যা। এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, “ক্রেতারা পণ্যের দামে ভ্যাট পরিশোধ করছেন, কিন্তু অনেক ব্যবসায়ী সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন না। এটা ভ্যাট সংস্কৃতির বড় সংকট।” তিনি জানান, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এনবিআর সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে আইনি কাঠামো বেশ আধুনিক হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি আছে। গুলশান মার্কেটের মতো কূটনৈতিক ও উচ্চবিত্ত এলাকায় যখন ব্যবসায়ীরা ই-রিটার্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন, তখন অন্যান্য এলাকায় ভ্যাট শৃঙ্খলা আরও দুর্বল হবে— যা রাজস্ব আহরণের বড় বাধা হিসেবে থেকে যাবে।