দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন উৎসবের বদলে এটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এ সময় তারা পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান।
মঙ্গলবার (২৩ সেটেম্বর) বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভিপি প্রার্থী শেখ সাদি হাসান ও জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় প্যানেলের অন্য প্রার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, প্রায় দেড় যুগের গুম, খুন, কারা নির্যাতন ও হামলার শিকার হয়েও ছাত্রদল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে এসেছে। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের জাকসু নির্বাচনে সেই সংগ্রামের স্বপ্ন অনেকটাই ধূলিসাৎ হয়েছে।
অভিযোগে জানানো হয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৮টি প্যানেলের মধ্যে ৫টি বর্জন করে, দুই জন কমিশনার পদত্যাগ করেন এবং ভোটগ্রহণ চলাকালে কয়েকজন শিক্ষক প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ান। স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থীও ভোট বর্জন করেন।
ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থীরা বলেন, নির্বাচনে ছবিসহ ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও অমোচনীয় কালি ব্যবহার করা হয়নি। এর ফলে জালভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় সংসদের ব্যালটে ক্রমিক নম্বর ও মুড়ি না থাকায় স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তাদের দাবি, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স কেন্দ্রে পাঠানো হয় এবং ভোটারের সংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত ব্যালট সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে লুটপাট ও কারচুপির পরিবেশ তৈরি করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একটি অখ্যাত কোম্পানি এইচআর সফট বিডির কাছ থেকে ব্যালট পেপার ও ওএমআর মেশিন কেনা হয়। সেখানে অতিরিক্ত তিন হাজার ব্যালট ছাপানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যালট ছাপানো হলে বিতর্ক এড়ানো যেত।
এ ছাড়া ফজিলাতুন্নেছা, জাহানারা ইমাম ও তাজউদ্দিন হলসহ বিভিন্ন হলে জালভোটের অভিযোগ ওঠে। জাহানারা ইমাম হলে বুথে নির্দিষ্ট দুই প্যানেলের লিফলেট রাখা হয়। ফজিলাতুন্নেছা হলে ব্যালট ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এই হলের প্রভোস্ট আগ্রাসীভাবে একটি প্যানেলের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। ওই প্রভোস্ট মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের শিক্ষক পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি নারী সাংবাদিকদেরও ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অধিকাংশ পোলিং অফিসারকে নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিধিবহির্ভূত আচরণ দেখা যায়। আবার প্রার্থীদের এজেন্ট রাখার বিষয়েও নানা টালবাহানা করা হয়। প্রথমে এজেন্ট রাখার অনুমতি না দেওয়া হলেও গভীর রাতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়, পরে সকালে তাদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, রফিক জব্বার হলে মোট ভোট পড়ে ৪৭০টি, কিন্তু একটি পদের গণনায় ভোট যোগফল দাঁড়ায় ৫১৩টি। এ ছাড়া সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী নীলা অং মারমার ভোট দেখানো হয় শূন্য, যদিও হলে অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী ভোটার হিসেবে ছিলেন।
কিছু হলে ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নামই ছিল না। ভোটারদের হাতে লিখে জমা দিতে হয়। আবার ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেও কিছু আবেদনকারীর ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রদল অভিযোগ করে, ভোটের আগের দিন থেকেই ক্যাম্পাসের চারপাশে বহিরাগতদের জড়ো করা হয়। তারা প্রবেশপথে অবস্থান নেয় এবং ভেতরেও ঢুকে পড়েন। এমনকি ঢাকা-১৯ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আফজাল হোসাইন ডেইরি গেটে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাংবাদিকদের বলেন, তিনি কিছু জানেন না।
অভিযোগে বলা হয়, কাজী নজরুল ইসলাম হলে বিকাল পর্যন্ত ভোট কম থাকলেও শেষদিকে হঠাৎ বেড়ে যায়। ওই হলে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ঘোষিত ভোটের সংখ্যার সঙ্গে মেলেনি। একই অবস্থা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলেও দেখা যায়। তবে প্রশাসন ভোটার তালিকা ও সিসিটিভি ফুটেজ দেয়নি।
সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে তারা বলেন, দৈনিক সমকালে এক শিক্ষার্থী বলেন, তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়ে দেখেন তার ভোট আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টির সত্যতা পোলিং অফিসারও স্বীকার করেন। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক হলে মোট ভোট পড়েছে ৪৬৯টি, অথচ চার প্রার্থীর ঘোষিত ভোট যোগফল ৫০৯।
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের অভিযোগ, প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে জানালেও তারা কালক্ষেপণ করছে এবং দায় এড়াচ্ছে।
তারা বলেন, গণতন্ত্রের উত্তরণের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। নেপথ্যের সত্য বের করতে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা উচিত।
এ ছাড়া ফের তফসিল ঘোষণা করে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিও করেন তারা।
গত ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয় পায় শিবির সমর্থিত প্যানেল। নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।