৪০ শতাংশ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কীভাবে জাতীয় ঐক্য সম্ভব? প্রশ্ন রেখেছেন ইসলামি গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল। তিনি বলেন, সনদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। কিন্তু এটি সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে তৈরি করা হয়নি। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ রাজনৈতিক দল এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের ছাড়া কীভাবে জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় সনদ প্রতিষ্ঠা হবে? তাদের প্রতিনিধিদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল।
শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শেওড়াপাড়ায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি মনে করেন, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আলাদা রাখা উত্তম।
বলা হচ্ছে, যে-সব দল ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করেছিল, তাদের ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে ডাকা হয়নি- এই প্রসঙ্গে সাবেক এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের দোসরদেরকে বেশি রাখা দরকার ছিল। সেটাই ফ্যাসিবাদের জন্য সবচেয়ে বড় অমর্যাদা হতো, যদি তাদেরকেও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করানো হতো। কারণ তারা ব্যর্থ হয়েছে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে।
তিনি মন্তব্য করেন, ‘জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এখনও চূড়ান্ত নয়। এটি কার্যকর করতে গণভোটের প্রয়োজন। পার্লামেন্টে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিতে পারে না। গণভোটে সাধারণ মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবে। তাই আমি মনে করি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আলাদা হওয়া উচিত।’
গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দ্বিমতের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আউয়াল বলেন, ‘ভোটারদের মধ্যে অধিকাংশই কৃষক, শ্রমিক বা অর্ধশিক্ষিত। যখন তারা দুটি ব্যালট নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাবে—একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য, অন্যটি গণভোটের জন্য। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিতে বিভ্রান্তি হবে। আবার গণভোটে কোনোটায় ‘হ্যাঁ’ বলবে, কোনোটায় ‘না’ বলবে সেটাও আছে। তাই জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আলাদা রাখা উত্তম।’
আউয়াল বলেন, আমি মনে করি শেষ পর্যন্ত সবাই নির্বাচন চায়। কেউ পিআর পদ্ধতি চায়, কেউ সরাসরি ভোট। সরকারও বারবার বলেছেন, সময়মতো ভোট হবে। আমরা সরকারের প্রতি আস্থা রাখছি। জামায়াতও ভোটে আসবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ ৬ টি সংগঠনের বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে- এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনও রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে আমরা নই। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ বা তাদের সাথে যারা অন্যায় অপরাধ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং বিচার শুরু হয়েছে। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করা হোক। যদি শেখ হাসিনাও এর মধ্যে থাকেন, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলের সাধারণ সমর্থকদের কোনও দোষ নেই, তাই দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত নয়।
গণ-অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল যে দেশের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হবে। এম এ আউয়াল বলেন, আমরা যে লক্ষ্য সামনে রেখে গণ-অভ্যুত্থান করেছি, ফ্যাসিবাদী সরকারকে বিদায় দিয়েছি। সেই সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন সরকারের প্রতি আস্থা ছিল যে তারা হয়ত দেশের মানুষের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে ভুল-ত্রুটি ঘটেছিল, তা সংশোধনের জন্য সরকার বিভিন্ন কমিশন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে এবং সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে, সাধারণ, গরীব, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সেখানে ঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ঐকমত্য কমিশনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও তা আনা হয়নি।
সাবেক সংসদ সদস্য আউয়াল বলেন, ‘যেমন সংবিধানে কী থাকবে বা কী থাকবে না, একজন রিকশাওয়ালার তাতে কোনও আগ্রহ নেই। একজন দিনমজুর জানতে চায় বাজারে চাল, আটা, দ্রব্যমূল্য কত? বাড়ি ভাড়া কত? তারা চায় সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, জীবনযাপন সহজ করা। তাদের লক্ষ্য হলো : আয় ও ব্যয় সামঞ্জস্য রেখে সন্তানদের পড়াশোনা করানো, দুবেলা দু-মুঠো খাবার খাওয়া এবং শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন। কিন্তু জুলাই সনদে এসব বিষয়ের প্রতিফলন ঘটেনি।’
তিনি যোগ করেন, ‘এই দিকগুলো থাকলে জুলাই সনদ আরও পরিপূর্ণ হতো। সংস্কারের জন্য যা করা হয়েছে, সেটি ঠিক আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি ছিল।’