রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষ হয়েছে। বুধবার (৮ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১১টায় বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।
তবে বৈঠকের আলোচনার অন্যতম বিষয় বস্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সময়সীমা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এখন বিষয়টি নিয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে কমিশন।
এর আগে বৈঠকে একপক্ষ জাতীয় নির্বাচনের দিনে গণভোটের পক্ষে মত দেয় । তারা মনে করে এতে ব্যয় কিছুটা কমবে। আরেকপক্ষ নির্বাচনের আগে ভোটের দাবি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি একই দিনে দুটি ভোট হলে জনগণ বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে।
গণভোটের বিষয়ে অনেক দল দ্বিমত পোষণ করলেও গত ৫ অক্টোবরের বৈঠকে অধিকাংশ দলই একমত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপিসহ তাদের মিত্র দলগুলো জাতীয় সংসদের ভোটের দিন আলাদা ব্যালটে গণভোটের পক্ষে মত দেয়। তবে জামায়াত ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে প্রস্তাব দেয়।
বুধবার (৮ অক্টোবর) রাত সোয়া ১০টায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, গণভোট সংসদ নির্বাচনের দিন হলে যে ফলাফল, আগে হলেও তাই হবে। আমরা মনে করি এ মুহূর্তে গণভোটের প্রস্তাব নির্বাচন বিলম্বিত করার অপ্রয়াস। আমরা এগুলো পরিহার করার আহ্বান জানাই। তার মতে সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট হলে ব্যয় কমবে।
সন্ধ্যায় ব্রিফিংয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে দলের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নভেম্বরে গণভোট দেওয়ার দাবি জানান। তিনি জানান এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের পূর্ব প্রস্তুতি হয়ে যাবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে তার ভিত্তিতেই হবে জাতীয় নির্বাচন।
এ বিষয়ে এনসিপির পক্ষ থেকেও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের কথা বলেছেন নেতারা। রাতে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউন-কে বলেন এ বিষয়টি এখন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন জুলাই সনদ আইনি স্বীকৃতি পাবে গণভোটের মাধ্যমে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট হতে হবে। এতে বিশেষজ্ঞদের মতামত লাগবে। আমরা মনে করি একই দিনে দুটি ভোট হলে সমস্যা হতে পারে। যেহেতু ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন, সেক্ষেত্রে গণভোট খুবই সহজ। তবে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলে কমিশন যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাই মেনে নেবে তার দল। আর গণভোটে নোট অব ডিসেন্ট সেগুলো প্রত্যাহারের পক্ষে মত দেন তিনি।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, শুধু একমত বিষয়গুলোতেই গণভোট হতে হবে। যেখানে হ্যা না ভোটের কথা থাকবে। তবে এটিও জটিল প্রক্রিয়া। আর নোট অব ডিসেন্ট বিষয়গুলো নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে থাকতে পারে।আমরা মনে করি একই দিনে ভোটের পাশাপাশি গণভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা হবে না। যেভাবে ইউপি নির্বাচনে একাধিক ব্যালটে ভোট দেন ভোটাররা।
আমার বাংলাদেশ পার্টি এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সংবিধান আদেশ বা বিশেষ আদেশ যেভাবেই হোক জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে গণভোট আগে বা পরে হবে, সে বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত দিতে পারলে ভালো হয়। অন্যথায় একমত হওয়া কঠিন হতে পারে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, আমাদের পরস্পরের আস্থা ও বিশ্বাসের অভাবেই গণভোটের প্রশ্ন এসেছে। অন্যথায় এর প্রয়োজন হতো না।
তবে গণভোট সংসদ নির্বাচনের দিন না আগে হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। এ নিয়ে অনৈক্য হলে কামড়াকামড়ি করে আমরা নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবো।
গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ভোটের আগে গণভোট হলে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। আর ভোটের দিন হলে স্বতঃস্ফূর্ততা আসবে।
বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান শাহাদাৎ হোসেন সেলিম বলেন, গণভোটের পক্ষে না থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে আমরা রাজি হয়েছি। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের পক্ষেই আমাদের মত।
বাংলা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মোশতাক হোসেন বলেন, বিশেষ কোনো জুলাই সনদ আদেশ উচ্চ আদালতে টিকবে না। একমত হওয়া বিষয়গুলোতে গণভোট হওয়া যেতে পারে। সংবিধানকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া বিপজ্জনক।
তিনি বলেন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে হলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, সংবিধানের যেসব বিষয় নিয়ে ঐক্যমত্য হয়েছে, সেসব বিষয়ে গণভোট হতে পারে। ছাড় দিয়ে রাজি হয়েছি। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনের দিন আলাদা ব্যালটে হলে ভালো হয়।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)'র সাধারণ সম্পাদক কাফী রতন যে বিষয়গুলো একমত হয়েছি, সে বিষয়গুলো নিয়েই গণভোট হতে হবে। মৌলিক বিষয়ে সংস্কারের সুযোগ নেই। তাহলে আমরা স্বাক্ষর করবো না।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, আলোচনায় স্থবিরতা কাটানো সম্ভব। একই দিনে গণভোট হতে পারে।এখানে কারও রাজনৈতিক এজেন্ডার স্থান হতে পারে না।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, তার দল গণভোটের পক্ষে না থাকলেও ঐক্যের স্বার্থে ছাড় দিয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে নভেম্বরে ভোট হলে সনদ প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম দুই ধাপের সংলাপের ভিত্তিতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত ভাষ্য তৈরি করে কমিশন। এরপর সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর তৃতীয় ধাপের বৈঠক শুরু করে কমিশন।
এরই মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব তুলে ধরেছিলো কমিশন। সে প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার একটি ‘সংবিধান আদেশ’ জারি করতে পারে। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। এরপর আদেশটি নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট করা যেতে পারে।
সর্বশেষ গত ৫ অক্টোবর গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মোটামুটি ঐকমত্য পোষণ করে। সেক্ষেত্রে গণভোট নির্বাচনের আগে হবে না ভোটের দিন হবে তা নিয়ে মতানৈক্য হয়। আজ শেষ দিনেও তার সুরাহা হয়নি।
সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে মোটা দাগে ৬টি সুপারিশ পেয়েছিলো কমিশন। সেগুলো হলো পূর্ণাঙ্গ সনদ বা তার কিছু অংশ নিয়ে গণভোট, বিশেষ সাংবিধানিক আদেশে, গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে বা ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন।
সংসদকে সংবিধান সংস্কার সভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কাছে এই মর্মে মতামত চাওয়া যে অন্তর্বর্তী সরকার এই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না।
এর আগে কমিশনের দ্বিতীয় দফার ২৩ কার্য দিবসের আলোচনা শেষ হয় গত ৩১ জুলাই।
কমিশনের পক্ষ থেকে দলগুলোর কাছে একাধিকবার খসড়া পাঠানো হয়েছে। তারাও তাদের মতামত দিয়েছে। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে কমিশন। এরই মধ্যে কমিশনের দ্বিতীয় দফা মেয়াদ শেষ হয় ১৫ সেপ্টেম্বর। সেদিন রাতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন দিয়ে মেয়াদ আরও এক মাস বাড়ানো হয়। যা বলবৎ থাকবে আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত।
বৈঠকে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, এলডিপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন , বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি ও আমার বাংলাদেশ পার্টি-এবিপার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
কমিশনের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
/এমকে/