ব্রাজিলের বেলেমে আগামী ১০ থেকে ২১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ৩০) । বিশ্ব নেতারা এমন এক সময়ে এই সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন, যখন বিশ্ব জলবায়ু সংকটের চরম পর্যায়ের মুখোমুখি।
প্যারিস চুক্তি সইয়ের দশ বছর পরও বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে উঠছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো বিভক্ত, জলবায়ু তহবিল প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে। এর ফলে রেকর্ড উষ্ণতা, বন্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে ধরিত্রীকে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু সংকট সৃষ্টি না করেও এর চরম প্রভাব ভোগ করছে। এমন পরিস্থিতিতে কপ৩০ সম্মেলন শুধু ন্যায্যতার নিবেদনই নয়, বরং এটি এক ধরনের পরীক্ষাও যে বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটুকু।
বেলেমে প্রায় ২০০ দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন, কিন্তু আশাবাদ খুব কম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহারের হুমকি দিয়ে রেখেছেন। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এমনটি হলে বৈশ্বিক সহযোগিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নেট-জিরো লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করবেন। প্রিন্স উইলিয়াম ব্রিটিশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে জলবায়ু কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরবেন।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ কার্বন নির্গমনকারী চীন শক্তিশালী আলোচনাকারী দল পাঠাচ্ছে, যদিও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উপস্থিত থাকবেন না। তার অনুপস্থিতি এবং ট্রাম্পের ঘোষণা ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের চিত্র ফুটিয়ে তুলছে। অথচ জলবায়ু সংকট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এসময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বৈশ্বিক ঐক্য।
অন্যদিকে, কয়েকশ জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্টের নিবন্ধন সম্মেলনের ওপর এক ধরনের চাপ বাড়িয়েছে। পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলো এসব লবিস্টের অংশগ্রহণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন। তাদের অভিযোগ, কপ এখন কর্পোরেট স্বার্থের কবলে।
মূল লক্ষ্য: জীবাশ্ম জ্বালানি, অর্থায়ন, বন ও জলবায়ু রক্ষা
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এবারের কপ আয়োজন করছেন আমাজন বনের পটভূমিতে। তিনি চান, এখান থেকেই আবারও জলবায়ু কূটনীতিতে আস্থা ফিরুক। পাশাপাশি তিনি ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরএভার ফ্যাসিলিটি নামে একটি তহবিল চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে ঘনবর্ষন বন রক্ষা করা দেশগুলো আর্থিক পুরস্কার পায়।
জীবাশ্ম জ্বালানি ধাপে ধাপে বাদ
এবারের সম্মেলনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে- বিশ্ব জীবাশ্ম জ্বালানি ধাপে ধাপে বাদ দেওয়ার একটি স্পষ্ট সময়রেখা নিশ্চিত করবে কি না। দুবাইয়ে কপ২৮ সম্মেলনে দেশগুলো কয়লা, তেল ও গ্যাস থেকে “পরিবর্তনের” ওপর সম্মত হয়েছিল। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো বলছে, এই পদক্ষেপ যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এখন কঠোর সময়সীমা ও জবাবদিহি দাবি করছে।
জলবায়ু অর্থায়ন
ধনী দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে ২০%-এরও কম অর্থ এসেছে, যা বেশিরভাগ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো দাবি করছে, বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অর্থ দিতে হবে।
ঢাকায় একজন পরিবেশ নীতি বিশ্লেষক বলেন, “টেবিলে বাস্তব অর্থ না থাকলে, এই প্রতিশ্রুতিগুলো প্রতিদিন ঘর ও জীবিকা হারানো মানুষের জন্য খুব কমই কার্যকরী”
নবায়নযোগ্য শক্তি ও ন্যায়সংগত পরিবর্তন
সম্মেলন থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি ও ন্যায়সংগত পরিবর্তন ক্ষমতা তিনগুণ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনা হবে। তবে ব্রাজিল সম্প্রতি অ্যামাজন বেসিনে নতুন তেল অনুসন্ধান অনুমোদন করায় সমালোচকরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্থন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাহত করছে। বৈশ্বিক প্লাস্টিক চুক্তি এবং সামুদ্রিক নির্গমন আলোচনার বিলম্ব আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
তবে কিছু কূটনীতিবিদ বলছেন, কপ প্রক্রিয়াটি যতই অসম্পূর্ণ হোক না কেন, এটি একমাত্র বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম যেখানে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে পারে।
বাংলাদেশ: নেতৃত্বের লড়াই, ঝুঁকির মধ্যে
বাংলাদেশের জন্য কপ৩০ কেবল কূটনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াই। বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে ০.৫%-এরও কম অবদান থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭.৫% জলবায়ু সহনশীলতায় ব্যয় করা হয়, মূলত দেশীয় তহবিল থেকে।
কপ৩০ সম্মেলনে বাংলাদেশ চারটি অগ্রাধিকার তুলে ধরবে
ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিল: ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক তহবিলের সরাসরি, শর্তবিহীন প্রবেশাধিকার; তবে ঋণ নয়, অনুদান হিসেবে।
অভিযোজন অর্থায়ন: জলবায়ু তহবিলের ৫০% ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজনের জন্য নির্ধারণ।
সবুজ প্রযুক্তি স্থানান্তর: সৌর, বায়ু ও সবুজ শিল্প প্রযুক্তিতে অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ।
জলবায়ু সংকটজনিত বাস্তুচ্যুতির স্বীকৃতি : আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু-প্ররোচিত স্থানচ্যুতিকে মানবিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি।
তবে, বিশেষজ্ঞরা বলছে, শুধু আলোচনা কিংবা প্রতিশ্রুতি নয়; বেলেম সম্মেলন থেকে বাস্তব ফলাফল আসতে হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, “বিশ্বের দেশগুলো কপ৩০ সম্মেলনে তাদের নিজস্ব জাতীয় অ্যাজেন্ডা নিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, বাংলাদেশ এই সম্মেলন থেকে কী অর্জন করতে চায়।”