কৃষি থেকে অ্যাগ্রো-টেক: বাংলাদেশের পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক রূপান্তর

কৃষি থেকে অ্যাগ্রো-টেক: বাংলাদেশের পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক রূপান্তর

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি হলো কৃষি। বহু শতাব্দী ধরে আমাদের গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি, জীবিকা ইত্যাদি সবকিছুই কৃষিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন কৃষি মানেই ছিল কষ্টসাধ্য, কম উৎপাদনশীল এবং জলবায়ুর ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল একটি খাত। সময় বদলেছে। এখন বিশ্ব অর্থনীতি নতুন শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কৃষিও প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাগ্রো-টেক খাতে রূপ নিচ্ছে। এ পরিবর্তন শুধু উৎপাদন বাড়ানোই নয়, বাংলাদেশের কৃষিকে নতুন এক রপ্তানি-ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করার সুযোগও এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে আমরা শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, বরং উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারি। এরই মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে ড্রোন, আইওটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইড্রোপনিক্স, অ্যাকুয়াপনিক্স, অটোমেটেড গ্রিনহাউস, বায়োটেক সিড—এসব প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। আগে যেসব কাজ কৃষকের অভিজ্ঞতা বা আন্দাজের ওপর নির্ভর করত, এখন তথ্য বিশ্লেষণ তা নির্ভুলভাবে হিসাব করে দিচ্ছে। এই রূপান্তরই অ্যাগ্রো-টেক বিপ্লবের মূল শক্তি।

বাংলাদেশে অ্যাগ্রো-টেকের সম্ভাবনা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই নজর দিতে হবে পরিবর্তিত জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে। দেশে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত কমছে। কৃষিতে কম মানুষ কাজ করছে, তবে চাহিদা বেড়েছে উৎপাদন বাড়ানোর। এ ক্ষেত্রে যন্ত্রায়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ থেকে ৩০ বছর আগেও যেখানে ধান কাটার কাজ পুরোটাই মানুষনির্ভর ছিল, এখন সেই জায়গায় আসছে রিপার, হারভেস্টার, ট্রান্সপ্লান্টার। ফলে একই জমিতে কম সময়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। কৃষিতে সময়মতো জমি প্রস্তুত করা না গেলে যে বিপুল ক্ষতি হতো, প্রযুক্তি সেই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

অ্যাগ্রো-টেকে বাংলাদেশের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি যেখানে, সেটা হলো—স্মার্ট ফার্মিং। বিশ্ব এখন পানি সাশ্রয়ী কৃষিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া কিংবা উত্তরাঞ্চলের পানি সংকট, উভয় সমস্যা মোকাবিলায় সেন্সর নির্ভর সেচব্যবস্থা যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। আইওটি-ভিত্তিক স্মার্ট সেচ দিলে যেখানে ৩০–৪০% পানির সাশ্রয় হয় এবং সেখানে উৎপাদন বাড়ে ১৫–২০%, এটি ইতোমধ্যে গবেষণায় প্রমাণিত। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণ দেশে এ ধরনের প্রযুক্তি একটি টেকসই কৃষি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশে ড্রোন কৃষির ব্যবহার এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও এর সম্ভাবনা সীমাহীন। ড্রোন দিয়ে সার ও কীটনাশক ছিটানো শুধু সময় বাঁচায় না, মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিকেও কমায়। বিশেষ করে মাছ ও চিংড়ি খামারে ড্রোন ব্যবহার করলে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্যসাশ্রয় দুটোই সম্ভব। চীনের মতো দেশ এখন ড্রোন ফার্মিংকে কৃষি রপ্তানির অংশ করে ফেলেছে। বাংলাদেশও চাইলে ড্রোন-ভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারে, যা একসময় বড় বাজার তৈরি করবে।

অ্যাগ্রো-টেক বিপ্লবের আরেকটি মুখ্য দিক হলো বায়োটেকনোলজি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ এলাকায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে লবণাক্ততা সহনশীল ধান, খরা সহনশীল গম বা বন্যা সহনশীল আমন ধান—এসব উদ্ভাবন বাংলাদেশের কৃষিকে নতুন শক্তি দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের বায়োটেক বীজ শুধু স্থানীয় উৎপাদন নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বড় বাজার লক্ষ্য করেও তৈরি করা যেতে পারে। ভুট্টা ও সবজি বীজ রপ্তানিতে বাংলাদেশের আগ্রহ বাড়ছে, যা অ্যাগ্রো-টেকভিত্তিক বায়োটেক বাজারকে আরও শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের কৃষিতে আরেকটি নীরব বিপ্লব চলছে—গ্রিনহাউজ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষাবাদ। আগে যেসব ফসল মৌসুমি ছিল, এখন সেগুলো বছরজুড়ে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে টমেটো, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি, লেটুস এগুলো আগে রপ্তানি পর্যায়ে কখনই ভাবা হয়নি। কিন্তু এখন আধুনিক গ্রিনহাউজ প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী এসব ফসল উৎপাদন হচ্ছে। আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ সেফটি-সার্টিফায়েড ফ্রেশ ভেজিটেবল রপ্তানিতে বিশাল বাজার তৈরি করতে পারে, যদি প্রযুক্তি ভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো যায়।

এদেশে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে অ্যাগ্রো-টেক উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ খাতে। দেশের তরুণ উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যেই ডিম, মধু, ফল, সবজি, মাছ, এইসব খাতে ব্লকচেইন নির্ভর অনলাইন মার্কেটিং, কোল্ড চেইন লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মতো সেবা চালু করছেন। আগে যে কৃষিপণ্য সরাসরি বিদেশে পাঠানোর সুযোগ ছিল না, এখন এসব উদ্যোক্তা গালফ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ইউরোপের বাজারে পণ্য সরবরাহ করছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রান্তিক কৃষক থেকে শহুরে রপ্তানিকারক, সবাই মিলে সংযুক্ত একটি নতুন কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠছে।

রপ্তানি খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং কোল্ড চেইন। বাংলাদেশে উৎপাদন ঠিক হলেও রপ্তানি পর্যায়ে মান রক্ষা করা যায় না বলেই অনেক পণ্যের বাজার হারায়। অ্যাগ্রো-টেকের এই অংশটি এখন দ্রুত উন্নতির পথে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত গুদাম, সাপ্লাই চেইন সফটওয়্যার, রিয়েল-টাইম মনিটরিং, এসব সেবা যুক্ত হলে বাংলাদেশের উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য যেমন, আম, কাঁঠাল, ড্রাগন ফ্রুট, এমনকি ফুল বিশ্ববাজারে নতুন পরিচিতি পেতে পারে।

বাংলাদেশের কৃষিকে রপ্তানিমুখী করতে হলে তিনটি বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ জরুরি—মান, প্রযুক্তি এবং বাজার। প্রথমত, পণ্যের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে হবে। ইউরোপের জিএপি, যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, মধ্যপ্রাচ্যের এসএএসও—এসব মানদন্ড আমরা অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার অনেকগুণ বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, কৃষিতে প্রযুক্তি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকার, বেসরকারি খাত ও স্টার্টআপ—এই তিন পক্ষের যৌথ উদ্যোগ না হলে অ্যাগ্রো-টেক বিপ্লব পূর্ণতা পাবে না।

তৃতীয়ত, গ্লোবাল ব্র্যান্ডিং বা বাজারজাতকরণে জোর দিতে হবে। শুধু উৎপাদন নয়, বাংলাদেশের নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির গল্পের ঘটনা তৈরি করতে হবে।

অ্যাগ্রো-টেকের মাধ্যমে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণও বাড়বে। কারণ প্রযুক্তি শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে এনে দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়। স্মার্ট ফার্মিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, অ্যাপ-ভিত্তিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট—এসব খাতে নারীরা আরও বেশি যুক্ত হতে পারে। ফলে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির এক বিশাল ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়াবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষি এখন এক নতুন যাত্রাপথে। প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষি খাত শুধু টিকে থাকবে না, আরও প্রসারিত হবে। বিশ্বায়নের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমাদের সামনে সুযোগ রয়েছে, অ্যাগ্রো-টেকের সঠিক ব্যবহার করে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করা। কৃষি থেকে অ্যাগ্রো-টেক, এটাই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক রূপান্তর।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin