লাদাখের ‘জেন জি’ কেন বিজেপি দফতরে আগুন লাগালো? সরকারের নিশানায় ‘র‍্যাঞ্চো’

লাদাখের ‘জেন জি’ কেন বিজেপি দফতরে আগুন লাগালো? সরকারের নিশানায় ‘র‍্যাঞ্চো’

ভারতের উত্তরতম প্রান্তে, দেশের সবচেয়ে শান্ত ও নির্জন এলাকাগুলোর একটা হলো লাদাখ। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের লাখ লাখ পর্যটক লাদাখের অনিন্দ্যসুন্দর লেহ, নুবরা ভ্যালি বা জাঁস্কারে বেড়াতে যান, ফিরে আসেন অপূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে।

লাদাখের সঙ্গে চীনের সীমান্তে গালওয়ান ভ্যালিতেই কয়েক বছর আগে ভারতের সঙ্গে চীনের সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছিল, সেই সীমান্তে উত্তেজনাও থাকে অহরহ। কিন্তু লাদাখের অভ্যন্তরে তার আঁচ পড়ে না বললেই চলে। এমন কী গোটা দেশের মধ্যে অপরাধের হার সবচেয়ে কম যে সব এলাকায়, লাদাখ সেই তালিকাতেও একেবারে ওপরের দিকে।

এহেন ‘স্বর্গসম’ লাদাখে গতকাল (বুধবার) যা ঘটে গেলো, সেটির জন্য আসলে প্রস্তুত ছিল না কেউই।

অশান্তি আর ক্ষোভের আগুন অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই ধিকিধিকি জ্বলছিল, কিন্তু লাদাখের তরুণরা যেভাবে বুধবার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আর লাদাখ হিল কাউন্সিলের সদর দফতরে আগুন লাগালো, রাস্তায় অজস্র গাড়ি ভাঙচুর করলো ও লুঠপাট চালালো, কারফিউ অমান্য করে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালো–তা কেউ ভাবতেই পারেননি।

এই গোটা ঘটনায় চারজনের প্রাণহানি হয়েছে, জখম হয়েছেন ৮০জনেরও বেশি–যার মধ্যে অর্ধেকই পুলিশ বাহিনীর সদস্য।  

পরিস্থিতি একটু নিয়ন্ত্রণে আসতেই এখন যথারীতি কথাবার্তা শুরু হয়েছে লাদাখের ‘জেন জি’ এভাবে ক্ষেপে উঠলো কেন?

বাংলাদেশ বা নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীই তাদের উৎসাহিত করেছে কি না, না কি এর পেছনে অন্য কোনও শক্তির প্ররোচনা ছিল–তা নিয়েও শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা।

নজর থ্রি ইডিয়টসের ‘র‍্যাঞ্চো’-র ওপর

এমন কী ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনার পর যে বিবৃতি দিয়েছে তাতেও আঙুল তোলা হয়েছে সুপরিচিত লাদাখি অ্যাক্টিভিস্ট সোনাম ওয়াংচুকের দিকে।

তিনিই নাকি তার ‘অনশন প্রতিবাদে’র সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন এবং ‘আরব বসন্ত’ ও নেপালের জেন জি-দের প্রসঙ্গ টেনে এনে লাদাখি তরুণদের সহিংসতায় প্ররোচিত করেছেন। অথচ এই সহিংসতাকে ‘অর্থহীন’ বলে বর্ণনা করে ওয়াংচুক কিন্তু ইতোমধ্যে তার অনশন কর্মসূচিতে ইতি টেনেছেন।

এই সোনাম ওয়াংচুকের আদলেই বলিউডের সুপারহিট ছবি ‘থ্রি ইডিয়টসে’র ‘র‍্যাঞ্চো' (ভূমিকায় আমির খান) চরিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মী হিসেবে গোটা দেশেই তিনি একটি শ্রদ্ধেয় নাম। কিন্তু এখন দেশের সরকার সরাসরি তার সঙ্গে সংঘাতে নামছে এবং হামলার জন্য পরোক্ষভাবে তাকেই দায়ী করা হচ্ছে।  

এরই মধ্যে ভারতের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া চ্যানেল এনডিটিভি জানিয়েছে, সোনাম ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠানে বিদেশি অর্থায়ন কারা করছে এবং তাতে নিয়ম ভাঙা হয়েছে কি না, ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই সেটির তদন্ত শুরু করেছে।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d564a3a2feb" ) );

এমন কী, চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি কেন পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন, খতিয়ে দেখা হচ্ছে সেটাও।  

বছরপাঁচেক আগে ঢাকায় গিয়ে ব্রিটিশ হাইকমিশনে সোনাম ওয়াংচুক দেখা করেছিলেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে, দুজনের আলিঙ্গনরত ছবি পোস্ট করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়াতেও। সেই পুরনো ছবি এখন আবার সামনে এনে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গেও কি তার ঘনিষ্ঠতা আছে? থাকলে তা কতটা গভীর?

সোনাম ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠান ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিইট অব অল্টারনেটিভস লাদাখ’ বা ‘হিয়াল’-কে একটি জমির বরাদ্দ দিয়েও লাদাখের প্রশাসন গত মাসে তা আচমকা বাতিল করে দেয়, যা নিয়ে ওই সময় তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। লাদাখের পরিস্থিতি হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠার পেছনে সরকার যে সোনাম ওয়াংচুক ও তার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখছে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d564a3a3020" ) );

আলাদা রাজ্যের দাবি ও ‘ষষ্ঠ তফসিল’

লাদাখের আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি দুটো। প্রথমত, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একটি পূর্ণ অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা পাওয়া এবং দ্বিতীয়ত, লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের (সিক্সথ শিডিউল) আওতায় নিয়ে আসা, যাতে আদিবাসীপ্রধান রাজ্য হিসেবে এটি তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে এবং ‘স্বশাসিত’ অঞ্চল হিসেবে কিছু বিশেষ অধিকার পায়।

বছরপাঁচেক আগেও লাদাখ ছিল জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের একটি অংশ। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে যখন সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করে ভারত সরকার কাশ্মিরের বিশেষ স্বীকৃতি কেড়ে নেয়, তখন কাশ্মীরের থেকে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করে সেটিকে একটি আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। এরপর গত বছর জম্মু ও কাশ্মীরে ভোট হয়েছে এবং তারা তাদের একটি নিজস্ব বিধানসভাও পেয়েছে, কিন্তু লাদাখ রয়ে গেছে সেই আগের অবস্থাতেই।

লাদাখকে আলাদা রাজ্য ঘোষণার দাবিতে যে দুটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে লড়ছে, তারা হলো ‘লেহ অ্যাপেক্স বডি’ (ল্যাব) আর কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ)। লাদাখের জনসংখ্যার অর্ধেক বৌদ্ধ আর অর্ধেক মুসলিম (প্রধানত শিয়া)। আর এই আন্দোলনে কিন্তু বৌদ্ধ ও শিয়ারা হাতে হাত মিলিয়েই লড়ছেন।

নিজেদের দাবি পূরণে সরকারকে চাপ দেওয়ার লক্ষ্যে ল্যাব’র জনা পনেরো সদস্য গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩৫ দিনের অনশন ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলন শুরু হওয়ার ঠিক দু’সপ্তাহের মাথায় (মঙ্গলবার ২৩ সেপ্টেম্বর) ল্যাব’র সদস্য দুজন অনশনকারীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। আর এর পর থেকেই তথাকথিত ‘জেন জি’-দের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

ল্যাব তখন দাবি করে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে তাদের সঙ্গে রফা আলোচনায় বসতে হবে। দিল্লির তরফে সেই প্রস্তাবিত বৈঠকের তারিখ দেওয়া হয় ৬ অক্টোবর, মানে অনশনকারীরা অসুস্থ হয়ে পড়ার বারো দিন পরে। এতেই আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আন্দোলনকারীরা, তারা রাজপথে নেমে ভাঙচুর ও সহিংসতা শুরু করে দেয়।

jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68d564a3a3056" ) );

কেন্দ্রীয় সরকার এখন বলছে, তারা ‘ল্যাব’র দুটো দাবি বিবেচনা করতে রাজি। যেগুলো হলো, লাদাখে আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করা যাতে সেখানে কর্মসংস্থানের সুরাহা হয়, এবং লাদাখে লোকসভার পার্লামেন্টারি আসনের সংখ্যা একটা থেকে বাড়িয়ে দুটো করা। কিন্তু আলাদা অঙ্গরাজ্যের স্বীকৃতি এবং ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি নিয়ে কেন্দ্র একেবারেই নীরব–যা লাদাখি তরুণদের শাসক দল বিজেপির ওপর প্রবল ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

রাজধানী লেহ-তে বিজেপি দফতরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সেই ক্ষোভেরই পরিণতি বলে অনেকে ধারণা করছেন।

কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পদস্থ সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘লাদাখ দেশের এমন একটি অঞ্চল যার সঙ্গে চীনের শত শত মাইল সীমান্ত আছে এবং সেই সীমান্তে কয়েক লাখ চীনা সেনাও মোতায়েন আছে। এই সীমান্ত খুবই উত্তেজনাপ্রবণ। এমন একটি প্রবল স্পর্শকাতর এলাকায় স্থানীয়রা চাইলেই হুট করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, জাতীয় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সরকারকে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’  

শান্ত লাদাখের শান্তিপূর্ণ রাজধানীতেও যে একটা ছোটখাটো ‘জেন জি’ অভ্যুত্থান এ সপ্তাহে ঘটে গেলো, সম্ভবত তার পেছনেও আছে শাসক আর প্রজাদের দেখার দৃষ্টিতে এই ফারাকটা।    

 

Comments

0 total

Be the first to comment.

More from this User

View all posts by admin