প্রশ্ন
আমার বয়স ৪৫। আমি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করি। চার বছর আগে আমার ডিভোর্স হয়ে যায়। আমাদের কোনও সন্তান ছিল না। ডিভোর্সের কারণ হিসেবে আত্মীয় স্বজনরা এই সন্তান না থাকাকেই দায়ী করে থাকেন। সন্তান না হওয়াকে কেন্দ্র করে সাংসারিক জীবনেও অনেক জটিলতার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। একসময় আমরা জানতে পারি, সমস্যাটা আমার প্রাক্তন স্বামীর ছিল। এবং তিনিই জোর করে আমাকে ডিভোর্সে রাজি করান। বিচ্ছেদের সময় সে আমাকে অনুরোধ করে, আমি যেন তার দ্বিতীয় বিয়ের আগে বিয়ে না করি। কারণ আমার সন্তান হলে মানুষজন জেনে যাবে- সমস্যাটা তার! এখন ৬ মাস হলো আমার একজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, আমাদের দুই পরিবার চায় আমরা বিয়ে করে সংসার শুরু করি। কিন্তু প্রাক্তনকে দিয়ে আসা কথা আমাকে ভোগাচ্ছে। এখন আমার কী করা উচিত। যতদূর জানি, তার জন্য মেয়ে দেখার কাজ চলছে, এখনও কিছু চূড়ান্ত হয়নি।
উত্তর
আপনার বর্তমান দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে আপনার প্রাক্তন স্বামীর একটি অন্যায় এবং আবেগপূর্ণ অনুরোধ। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আপনার নয়, তার নিজের মান-সম্মান রক্ষা করা। এখানে আপনার কী করা উচিত, তা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরছি-
আপনার সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত সম্পূর্ণভাবে নিজের জন্য। কারণ আপনার ডিভোর্স হয়ে গেছে। তিনি যে অনুরোধটি করেছিলেন, তা কোনও আইনি বা নৈতিক চুক্তি নয়। বরং এটি ছিল তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা ঢাকার একটি প্রচেষ্টা। আপনার প্রাক্তন স্বামীর জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা আপনার জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনও অধিকার আর নেই। চার বছর কঠিন সময় পার করার পর আপনি একজন ভালো মানুষ এবং আপনার পরিবারের সমর্থন পেয়েছেন। আপনার এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত এই নতুন সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেকে সুখী করা। মনে রাখবেন, সত্য লুকানোর দায়িত্ব আপনার নয়। সন্তান না হওয়ার সত্যটি আপনার প্রাক্তন স্বামীর ছিল এবং এই সত্যটি প্রকাশ হওয়ার ভয় তার নিজের সমস্যা। এই সমস্যা থেকে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনার নয়। সমাজ কী ভাববে, তার চেয়ে আপনার ব্যক্তিগত শান্তি ও সুস্থ জীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি এবং আপনার হবু সঙ্গী যেহেতু একে অপরের সাথে যোগাযোগ তৈরি করেছেন এবং পরিবারগুলোও সম্মতি দিয়েছে, তাই আর দেরি না করে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করুন। আপনার প্রাক্তন স্বামীর বিয়ের জন্য অপেক্ষা করার কোনও দরকার নেই। পুরনো দিনের চাপ বা অপরাধবোধ থেকে নিজেকে মুক্ত করুন।
প্রশ্ন
আমার দুই ছেলে ও স্বামীর সংসার। স্বামী বড় চাকুরে। বড় ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছে, ছোট ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। ৫০ বছর পার করে আসা জীবনে আমি নিজের ক্যারিয়ার, ইচ্ছা অনিচ্ছা সবই বিসর্জন দিয়েছি সন্তানদের মানুষ করার জন্য। কিন্তু এখন এই সন্তানেরাই মনে করে আমি কেবল তাদের যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্য দেয়ার জন্য আছি। আমার কোনও ইচ্ছে থাকতে নেই, আমার কোনও সিদ্ধান্ত থাকতে নেই। এবং ওরা বড় হয়ে যাওয়ার পরে এখন যে আমার নিজেকে বেকার মনে হয় সেটাও তারা বুঝতে চেষ্টা করে না। আমার এই একাকীত্বের সময় আমি যদি নিজের মতো বাইরে যাই, একটু বন্ধুদের বাসায় ডাকি সেটা তাদের পছন্দ না। সাফ জানিয়ে দেয় আচরণের মধ্য দিয়ে। তাদের এই আচরণে আমি কষ্ট পাই। ওদের মানুষ করতে পারিনি বলেই ওরা এরকম সেই দোষটাও তো আমার। এই বয়সে এমন যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় কী?
উত্তর
আপনার মনের ভেতরের এই কষ্ট এবং শূন্যতা সম্পূর্ণরূপে অনুভব করতে পারছি। আপনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় এবং শক্তি দিয়ে দুটি মানুষকে (আপনার ছেলেদের) বড় করে তুলেছেন। এই আত্মত্যাগ শুধুমাত্র একজন মা-ই করতে পারেন। কিন্তু এখন তারা আপনার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনকে সম্মান দিচ্ছে না—এটা সত্যিই বেদনাদায়ক এবং হতাশাজনক।
আপনাকে প্রথমে একটি বিষয় স্পষ্ট করে জানাতে চাই, তাদের এই আচরণের জন্য আপনি দায়ী নন। সন্তানরা বড় হওয়ার পর নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেলে বা বাবা-মায়ের প্রতি সংবেদনশীলতা হারালে তার দায়ভার সম্পূর্ণভাবে মায়ের নয়। আপনি আপনার নিজের মর্যাদা ফিরে পেতে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন।
১. আপনাকে প্রথমে মানসিক স্তরে পরিবর্তন আনতে হবে। ‘মা’-এর খোলস থেকে বেরিয়ে আসুন। এখন আপনাকে আবার ‘একজন ব্যক্তি’ হিসেবে নিজের জীবন শুরু করতে হবে।
২. জীবনে যে ক্যারিয়ার, শখ বা ইচ্ছেদের আপনি বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনুন। হতে পারে সেটা কোনও চাকরি বা ব্যবসা শুরু করা। কোনও কোর্স করা, লেখালেখি বা ছবি আঁকা শুরু করা। এটি আপনার মনকে ব্যস্ত রাখবে।
৩. আপনার সন্তানেরা তাদের আচরণের মধ্য দিয়ে যা পছন্দ করছে না, সেটিকে আপনাকে উপেক্ষা করতে শিখতে হবে। আপনার বন্ধুরা আপনার বাসায় এলে বা আপনি বাইরে গেলে যদি তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে, তবে তাদের স্পষ্ট করে জানান যে এটি আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এর জন্য তাদের অনুমতির প্রয়োজন নেই। যেহেতু আপনার ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছে বা পেরোচ্ছে। তারা এখন প্রাপ্তবয়স্ক। মা হিসেবে আপনার দায়িত্ব ছিল তাদের স্বাবলম্বী করা। আপনি ওদের কাজ করে দেওয়া ধীরে ধীরে বন্ধ করুন। এটা আরও আগে করতে হতো। তাদের জন্য সবসময় খাবার তৈরি করে টেবিলে পরিবেশন করা বন্ধ করুন। তাদের বলুন—তারা নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার গরম করে নিতে পারে।
যদি মানসিক কষ্ট খুব তীব্র হয় এবং আপনি একা এই পরিস্থিতি সামলাতে না পারেন, তবে একজন পেশাদার মনোবিদের (Counsellor/Therapist) সাহায্য নিতে পারেন। এটি আপনার দুর্বলতা নয়, বরং পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে সামলানোর জন্য বিচক্ষণতার পরিচয়।