বাংলাদেশি কর্মীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ এবং জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুরক্ষা সামগ্রী প্রস্তকারক শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এনসেল লিমিটেড মালয়েশিয়ার মেডিসেরামের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থগিত করেছে। বাংলাদেশের ১৭৭ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ার কোম্পানিটি বহিস্কার করেছিল; যারা বকেয়া বেতনের দাবিতে বেশ কিছুদিন আন্দোলন করছিলেন। বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) এনসেল লিমিটেড এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
অ্যানসেল একটি অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি; যারা শিল্প-কারখানায় সুরক্ষাসামগ্রী প্রস্তকারক প্রতিষ্ঠান। তবে একাধিক দেশে এর করপোরেট সদর দফতর রয়েছে। যেমন- মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া; ব্রাসেলস, বেলজিয়াম; নিউ জার্সি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাইবারজায়া, মালয়েশিয়া। অস্ট্রেলিয়ায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হলেও বিশ্বের ৫৫টি দেশে তারা ব্যবসা পরিচালনা করে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অ্যানসেল ঘোষণা করেছে, মালয়েশিয়ার ছোট একটি সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেডিসেরামের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থগিত করেছে। ওয়ার্ক ভিসা নবায়ন ইস্যুতে বারবার ধর্মঘটের পর মেডিসেরাম এবং তার বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি সম্পর্কে উদ্বেগ থেকে এই স্থগিতাদেশ শুরু হয়; যা মালয়েশিয়ার অভিবাসন ও শ্রম কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারাধীন রয়েছে। গত আগস্টে একটি বিবৃতিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, মেডিসেরাম অ্যানসেলসহ তার গ্রাহকদের উত্থাপিত উদ্বেগের পরে তার কর্মীদের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করেছে। এই চুক্তিটি বাস্তবায়নের ফলে মূল সম্মত সময়সীমার আগে বর্তমান কর্মীদের নিয়োগ ফি হিসেবে ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর অ্যানসেল জানতে পারে, মেডিসেরাম ১৭৭ জন বিদেশি কর্মীকে তাদের কাজ করতে অস্বীকার করার কারণে বরখাস্ত করেছে। অ্যানসেল তৎক্ষণাৎ মেডিসেরামের কাছে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে যে, এই পরিস্থিতিতে এটি উপযুক্ত পদক্ষেপ নয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেডিসেরামের পুনর্বিবেচনার কোনও ইচ্ছার অনুপস্থিতিতে, অ্যানসেল ৪ নভেম্বর মেডিসেরামকে জানিয়েছিলে, আনসেল কোম্পানির সঙ্গে তার সরবরাহকারী সম্পর্ক স্থগিত করছে। সরবরাহকারী সম্পর্ক পুনর্বহালের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তে অ্যানসেল পুনরায় মেডিসেরামের সঙ্গে যুক্ত হবে।
শর্তের মধ্যে আছে– দ্রুত মেডিসেরামের সব বকেয়া পরিশোধ করা এবং শ্রমিকদের কল্যাণ রক্ষার জন্য একটি টেকসই প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করা এবং সব শ্রমিক, বিশেষত যারা বরখাস্ত হওয়া এবং প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় রয়েছে, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কভার করার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
মালয়েশিয়ায় দুটি কোম্পানির নির্যাতন এবং জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর প্রতিবাদে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে সোমবার (১০ নভেম্বর) প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে মানববন্ধন করা হয়েছে। মানববন্ধনে মালয়েশিয়ার দুইটি কোম্পানি মডিকেরাম এবং কাওয়াগুচি ম্যানুফেকচারিয়ের শোষণের শিকার ৪৩১ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের জন্য দ্রুত সহায়তা দাবি এবং মালয়েশিয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
ভুক্তভোগী কর্মীরা জানান, মেডিক্রেমে বছরের পর বছর শ্রমিকরা বিলম্বিত বেতন, হুমকি, নির্যাতন ও অমানবিক বাসস্থানের শিকার হয়েছেন। কোম্পানি তাদের পাসপোর্ট জব্দ করে রাখায় তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কাজের অনুমতিপত্র (পারমিট) নবায়ন না হওয়ায় অনেকে অবৈধ হয়ে গেছেন, যা জোরপূর্বক শ্রম ও আধুনিক দাসত্বের নিদর্শন। বহু ধর্মঘট ও বাহ্যিক চাপের পর কোম্পানি একবার রিক্রুটমেন্ট ফি ফেরত দিলেও, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১৫ জন শ্রমিককে জোরপূর্বক দেশে পাঠানো হয়। কারণ তারা পারমিট নবায়ন ও আগের শ্রমিকদের বকেয়া ফেরতের দাবি তুলেছিলেন।
কর্মীরা জানান, আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে প্রতিশোধমূলকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে এই কোম্পানিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।
কর্মীরা আরও জানান, কাওয়াগুচি সনি, প্যানাসনিক এবং দাইকিনের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী ছিল। শ্রমিকরা প্রচুর রিক্রুটমেন্ট ফি পরিশোধ করেও ২০২২ সাল থেকে বেতন অনিয়মের শিকার হন এবং গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত মাস কোনও বেতন পাননি। পরে ৩০৮ জন শ্রমিককে ওই প্রতিষ্ঠানের ক্রেতারা কিছু ক্ষতিপূরণ ও রিক্রুটমেন্ট ফি ফেরত দেন। তবে বকেয়া বেতন এখনও পরিশোধ হয়নি, যদিও মালয়েশিয়ার শ্রম দফতর গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর এক সমঝোতা বৈঠকের পর সম্মতিপত্র জারি করে। তবুও কোম্পানির তাইওয়ানি মালিক এখনও ২৫১ জন শ্রমিকের কাছে ৩০ লাখ রিঙ্গিত দেনা এবং কোম্পানি বকেয়া পরিশোধ না করেই বন্ধ ঘোষণা করে। এটি মালয়েশিয়ার শ্রম সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতা তুলে ধরে।
মানববন্ধনে শ্রমিকরা সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসব গুরুতর অপরাধে ন্যায়বিচার পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।