যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করলেও মার্কিন প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রুস্তেম উমেরভ। তিনি বলেন, পরিকল্পনার কোনও বিষয়ে তিনি আলোচনা বা অনুমোদন দেননি। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
ওয়াশিংটন কিয়েভকে ২৮ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এতে রাশিয়ার প্রধান দাবিগুলোর অনেকটাই অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া, সেনাবাহিনীর আকার কমানো এবং ন্যাটোতে যোগদানের আশা চিরতরে ত্যাগ করা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব উমেরভের সঙ্গে আলোচনা করেই পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, উমেরভ পরিকল্পনার বেশিরভাগ বিষয়ের সঙ্গে একমত হয়ে কিছু সংশোধনের পর সেটি জেলেনস্কির কাছে উপস্থাপন করেন। তবে উমেরভ টেলিগ্রামে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সফরে তার ভূমিকা ছিল কেবল কারিগরি, সাক্ষাৎকার আয়োজন এবং আলোচনার প্রস্তুতি। কোনও মূল্যায়ন বা অনুমোদন দেওয়া তার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের পর পরিকল্পনাটি তিনি পেয়েছেন। তবে এর বিষয়বস্তুর ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য করেননি। তিনি জানান, যুদ্ধের ইতি টানতে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে। আমরা গঠনমূলক, সৎ ও দ্রুত কাজ করতে প্রস্তুত।
ক্রেমলিন জানায়, কিয়েভ আলোচনায় বসতে প্রস্তুত কি না এ বিষয়ে এখনো তারা কোনও আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, পরিকল্পনায় রাশিয়ার দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রুশ দখল ঘোষিত পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো থেকে ইউক্রেনকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে, আর রাশিয়া অন্য অঞ্চলে দখল করা সামান্য কিছু এলাকা ছেড়ে দেবে। ন্যাটোতে যোগদান স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হবে এবং সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ৬ লাখে সীমাবদ্ধ থাকবে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও ধীরে ধীরে শিথিল হবে এবং দেশটিকে পুনরায় জি-৮ এ অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান দাবি হলো ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫ এর মতো বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। বিষয়টি এক লাইনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনও বিস্তারিত ছাড়াই।
ইউরোপীয় দেশগুলো পরিকল্পনা প্রণয়নে অংশ নেয়নি। ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কাইজা কালাস বলেন, যে কোনও পরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে ইউক্রেন ও ইউরোপকে সঙ্গে রাখতে হবে।
চলতি বছর দায়িত্বে ফিরে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার অঙ্গীকার করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে তিনি নীতি বদলে ২০২২ সালের আগ্রাসনের বেশ কিছু যুক্তি মেনে রাশিয়ার প্রতি নমনীয় অবস্থান নেন। তবে গত মাসে পুতিনের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন এবং রাশিয়ার দুটি তেল কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন, যা আগে কোনও মার্কিন প্রশাসন নেয়নি। শুক্রবার থেকে এসব নিষেধাজ্ঞার পূর্ণ প্রভাব কার্যকর হওয়ার কথা।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এক মাস ধরে পরিকল্পনাটি নিয়ে কাজ করেছেন এবং ট্রাম্প তা সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধের পর উভয় পক্ষের স্বার্থ নিশ্চিত করতে সর্বোত্তম পথ খুঁজেই পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে।
রণক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনী পিছিয়ে পড়ছে, আর সরকারের ওপর দুর্নীতির অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বুধবার দুই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছে পার্লামেন্ট। ২০২২ সালে কিয়েভের দিকে রুশ অগ্রযাত্রা প্রতিহত করে এবং দখলকৃত কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করে ইউক্রেন। কিন্তু ২০২৩ সালের পাল্টা আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর যুদ্ধ এখন ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার ফ্রন্টজুড়ে ক্লান্তিকর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। রাশিয়া ধীরে ধীরে কিছু অগ্রগতি পাচ্ছে।
শীত ঘনিয়ে এলেও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ইউক্রেন এখন রুশ দখলে এবং তারা ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা বাড়াচ্ছে। রাশিয়া দাবি করেছে, উত্তর-পূর্বের কুপিয়ানস্ক এবং পূর্বাঞ্চলের পোকরোভস্কের বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তারা পোকরোভস্কের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে টহলরত সেনাদের ভিডিওও প্রকাশ করেছে। কিয়েভ এসব দাবি অস্বীকার করলেও রাশিয়ার ধীর অগ্রগতির কথা স্বীকার করেছে।