ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন তরুণ জোহরান কে মামদানি (৩৪)। তিনি এখন ইতিহাসের অংশ। নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র হয়েছেন তিনি। তার এই ইতিহাস গড়ার সঙ্গে নতুন করে উঠে এসেছে বিখ্যাত নির্মাতা মীরা নায়ারের নামটিও।
কারণ, ইতিহাসের এই গল্পটা যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তানের হাতে রচিত।
মামদানি সম্পর্কে গত কয়েকদিনে প্রায় সবটুকুই জানা হয়েছে ভক্ত-পাঠকদের। এমনকি তার স্ত্রী সিরিয়ান বংশোদ্ভূত রামা দুয়াজিকে নিয়েও কম চর্চা হচ্ছে না বিশ্ব গণমাধ্যমে। এভাবেও বলা যায়, মামদানির ধর্ম, বয়স আর স্ত্রীর সৌন্দর্যে যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে কিংবদন্তি নির্মাতা মীরা নায়ারের গল্পটি।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নির্মাতা মীরা নায়ার, বিশ্ব সিনেমার এক সাহসী ভাষা। তার চলচ্চিত্রে নেই বাণিজ্যিক ঝলকানি, আছে মানুষ, সমাজ, বেদনা, দেশান্তর আর আত্মসংগ্রামের গল্প। জন্ম ভারতের রাউরকেলায়, পড়াশোনা হার্ভার্ডে, বসবাস নিউইয়র্কে—তবু তার শিল্পের ঠিকানা বার বার ফিরে গেছে প্রান্তিক মানুষের কাছে।
আজকের বিশ্ব সিনেমায় যে বাস্তববাদী চিত্রভাষার উত্থান, তার আদর্শিক পথিকৃৎদের একজন মীরা নায়ার।
মীরা নাইরের প্রথম শিল্পভুবন ছিল ডকুমেন্টারি। থিয়েটার আর ভিজ্যুয়াল জার্নালিজমের মধ্য দিয়ে তার চোখে ধরা পড়ে ভাঙা সমাজ, অবহেলিত মানুষ আর অদেখা বাস্তবতা। রাজনৈতিক, সামাজিক, অভিবাসী সংকট থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত দুঃসহ যাত্রা—তার ক্যামেরা যেখানে পড়ে, সেখানেই যেন বুনে যায় সত্যের টান টান ভাষা।
১৯৮৮ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘সালাম বোম্বে!’ যেন নীরব বিশ্বকে ঝাঁকুনি দিয়েছিলো। মুম্বাইয়ের পথশিশুদের জীবন অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা জিতে নেয় কান চলচ্চিত্র উৎসবের ক্যামেরা দ’র। অস্কারেও মনোনয়ন পায় সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে।
এরপর ‘মিসিসিপি মাসালা (১৯৯১) দিয়ে মীরা তুলে ধরেন বর্ণবাদ ও অভিবাসীদের গল্প, ‘মনসুন ওয়েডিং’ (২০০১), ‘দ্য নেমসেক’ (২০০৬)-এ পরিচয়, পরিবার ও অভিবাসনের দার্শনিক বিবৃতি গোট বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে।
তার প্রতিটি কাজই চলচ্চিত্র–নন্দনের পরিসরে একেকটি অনন্য দাগ হয়ে আছে।
মীরার সিনেমা হলো মানুষের গল্প। দেশান্তর, পরিবার, বর্ণ, শ্রেণি, স্মৃতি, হারিয়ে ফেলা শেকড়—সবকিছুর অনুপম বুনন। তার ছবিতে চরিত্র শুধু চরিত্র নয়—তারা মূলত এক একটি ইতিহাস, ব্যথা, স্বপ্ন ও অস্থিরতা।
নির্মাণের সুবাদে তিনি অর্জন করেছেন বিশ্বজুড়ে নানান পুরস্কার ও সম্মাননা। এরমধ্যে রয়েছে কান ক্যামেরা দ’র (১৯৮৮), ভেনিস গোল্ডেন লায়ন (২০২২১), ভারত সরকারের পদ্ম ভূষণ (২০১২) প্রভৃতি।
মীরা নায়ার সেই নির্মাতা, যিনি জানান—সিনেমা শুধু বিনোদন নয়; এটি সামাজিক দলিল। সেই দলিলেরই আরেক অনুলিপি যেন তারই সন্তান জোহরান মামদানি। যিনি ৩৪ বছর বয়সেই ইতিহাসে লিখিয়েছেন নাম।
বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, মীরা ও মামদানি: সিনেমা এবং বাস্তব জীবনের দুই যোদ্ধা। যারা দু’জনে মিলে রিল ও রিয়েল লাইফকে বেঁধে দিয়েছেন সিনেমা ও রাজনীতির সুতোয়।