মফস্‌সলের স্কুলের বিদেশি হেডমাস্টার

মফস্‌সলের স্কুলের বিদেশি হেডমাস্টার

আমাদের স্কুলের নাম বরিশালের উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন একজন বিদেশি। নব্বইয়ের দশকে বরিশালের মতো মন্থর মফস্‌সলে সুদূর কানাডা থেকে আসা প্রধান শিক্ষক ছিলেন এক বিস্ময়! বিশেষ করে আমাদের মতো শিশুদের কাছে। আমাদের বেশ গর্ব হতো যে আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক একজন বিদেশি, ব্রাদার এ্যালবারিক, সিএসসি।

ব্রাদারের চুল ছিল ধবধবে সাদা। হাফহাতা চেক শার্ট, ঢোলা ফরমাল প্যান্ট, পায়ে স্যান্ডেল, চোখে চশমা আর হাতে চিকন একটা বেত, এই ছিল তাঁর ইউনিফর্ম। শীতকালে শার্টের ওপর একটা জ্যাকেট চাপাতেন। হাতে বেত নিয়ে দুই হাত পেছনে রেখে গম্ভীরভাবে হাঁটতেন তিনি। তবে বেত দিয়ে মারতেন না, শুধু ভয় দেখাতেন। পেটের চামড়া টেনে ধরে দুই আঙুল দিয়ে চাপ দিতেন। এটা ছিল তাঁর শাস্তি দেওয়ার স্টাইল।

কথা বলতেন খুব মৃদু স্বরে। দুপুর ১২টার দিকে রাউন্ডে বের হতেন ব্রাদার। পুরো স্কুল হেঁটে হেঁটে চক্কর দিতেন। কোন ক্লাসে কী হচ্ছে দেখতেন। ক্লাসের সামনে কাউকে কান ধরে দাঁড়ানো দেখলে কাছে গিয়ে কথা বলতেন, কেন শাস্তি পেয়েছে শুনতেন। কারও পেটে চিমটি কাটতেন। কাউকে আবার হালকা বকা দিয়ে ক্লাসে ঢুকিয়ে দিতেন।

আমাকে স্কুলে আনা-নেওয়া করত আব্বু। একদিন দুপুরে বের হয়ে দেখি আব্বু আসেনি। স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশ দ্রুত খালি হয়ে গেল, গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ দুপুর। হঠাৎ মনে হলো আজকে আর আব্বু আসবে না। আমি বাসায় যেতে পারব না। ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম। তখন ক্লাস ফোরে পড়ি।

স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে কাঁদছি দেখে স্কুলের শিক্ষক দানিয়েল স্যার জানতে চাইলেন, কেন কাঁদছি। আমি বললাম, আব্বুর আমাকে নিতে আসার কথা, তিনি আসেননি। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, বাসার ফোন নম্বর আছে কি না? আমি কাঁদতে কাঁদতে আমার খাতায় লেখা বাসার ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিলাম।

দানিয়েল স্যার আমাকে নিয়ে গেলেন হেডমাস্টার ব্রাদার এ্যালবারিকের রুমে। তখন বেলা আড়াইটা বাজে। স্কুল ছুটি হয় বেলা দেড়টায়। ব্রাদার তখনো অফিসে কাজ করছেন। দানিয়েল স্যার ব্রাদারকে আমার বিষয়টা বললেন। ব্রাদার আমার দিকে তাকালেন। ইশারায় হাত দিয়ে চেয়ার দেখিয়ে আমাকে বসতে বললেন। আমি বসলাম।

ব্রাদারের রুমে থাকা ল্যান্ডফোন থেকে দানিয়েল স্যার আমার নানার বাসায় ফোন করলেন। ফোন রেখে আমাকে বললেন, ‘টেনশন কোরো না। তোমার বাসা থেকে লোক আসছে, তোমাকে নিয়ে যাবে।’ তারপর তিনি বের হয়ে গেলেন।  

আমি চুপচাপ বসে আছি ব্রাদারের রুমে। তিনি উঠে এসে আমার হাতে একটা চকলেট দিলেন। তাকিয়ে দেখি এ তো আমার পরিচিত কোনো চকলেট নয়, বিদেশি চকলেট! ব্রাদার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ডোন্ট ওরি, সন।’ ব্রাদার তাঁর ফাইলপত্র নিয়ে কাজ করতে থাকলেন। আমি তাকিয়ে দেখলাম, তিনি খুব গভীর মনোযোগের সঙ্গে কাজ করেন। এর আগে তাঁকে শুধু দূর থেকে দেখেছি। সেই প্রথম এবং শেষ এত কাছ থেকে দেখা।

আধা ঘণ্টা পর আমার মামা এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। ব্রাদারকে অশেষ ধন্যবাদ জানালেন তিনি। বিনিময়ে ব্রাদার মৃদু হাসলেন। এগিয়ে এসে আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন, বললেন, ‘গুড বয়।’ আমি বাসায় ফিরে এলাম। এমনিতে তাঁকে ভয় পেতাম। তবে সেদিনের পর ভয় কেটে গিয়েছিল।

বরিশালের উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ব্রাদার দায়িত্ব পালন করেন ১ আগস্ট ১৯৮২ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৭ পর্যন্ত, দীর্ঘ ১৫ বছর। ব্রাদার থাকতেন স্কুল লাগোয়া গির্জার কোয়ার্টারে। সকাল আটটায় স্কুল শুরু হতো। বেলা দেড়টায় ছুটি। তারপর আর ব্রাদারের দেখা পাওয়া যেত না। আমি কখনো উদয়ন স্কুলের কম্পাউন্ডের বাইরে ব্রাদারকে দেখিনি।

অবসরে যাওয়ার পর আর ব্রাদারের সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি আমাদের স্মৃতিতে রয়ে গেছেন, মফস্‌সলের স্কুলের বিদেশি হেডমাস্টার হিসেবে।

ফাহিম ইবনে সারওয়ার, রিং রোড, শ্যামলী, ঢাকা

প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]

Comments

0 total

Be the first to comment.

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে Prothomalo | বাংলাদেশ

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাইকোর্টের চার বিচারপতির বিষয়ে তদন্ত চলছে

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারপতির মধ্যে ৪ বিচারপতির বিষয়ে...

Sep 13, 2025
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক Prothomalo | বাংলাদেশ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের বৈঠক

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য...

Sep 12, 2025
দুর্গাপূজা যাতে শান্তিপূর্ণ না হতে পারে, সে জন্যই খাগড়াছড়ির ঘটনা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা Prothomalo | বাংলাদেশ

দুর্গাপূজা যাতে শান্তিপূর্ণ না হতে পারে, সে জন্যই খাগড়াছড়ির ঘটনা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

শারদীয় দুর্গাপূজা যেন শান্তিপূর্ণভাবে না হতে পারে, সে জন্যই খাগড়াছড়িতে ‘সহিংস ঘটনা ঘটানো’ হয়েছে বলে...

Oct 01, 2025

More from this User

View all posts by admin