রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে খোঁজ নেই আনাস্তাসিয়া স্ভিয়েতকোভার স্বামী ইয়ারোস্লাভ কোচেমাসভের। তার সহযোদ্ধারাও কিছু জানাতে পারেননি। আর মাঝেমধ্যে যুদ্ধশিবিরে প্রবেশাধিকার পাওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রেডক্রসও কিছু জানাতে পারেনি।
তাই আনাস্তাসিয়া জানেন পর্যন্ত না, তার স্বামী জীবিত নাকি মৃত।
বন্দী বা নিহত সেনার তথ্য ক্রেমলিনের তরফ থেকে নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না।
সম্প্রতি রাশিয়া হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় সেনার মরদেহ ফেরত পাঠিয়েছে। যদি সত্যিই কোচেমাসভ নিহত হয়ে থাকেন, তবে অন্তত শোক প্রকাশের সুযোগ পেতে পারেন স্ভিয়েতকোভা। কিন্তু সেটাও এখনও অনিশ্চিত, কারণ ইউক্রেনের ফরেনসিক শনাক্তকরণ ল্যাবগুলো একসাথে এত মৃতদেহ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক দেহ আংশিক পোড়া বা খণ্ডিত হওয়ায় শনাক্তকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
স্বামীর ভাগ্য জানতে না পারার বাস্তবতাই কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে স্ভিয়েতকোভাকে। রয়টার্সের প্রতিনিধিকে তিনি বলেন, ১১ বছর ধরে প্রতিদিন তার সঙ্গে থেকেছি। এখন এমন এক শূন্যতায় পড়েছি যেখানে নিশ্চিত কিছুই জানার উপায় নেই।
মৃত সেনার পরিচয়ের সন্ধানে
২৯ বছর বয়সী দন্তচিকিৎসক স্ভিয়েতকোভা ইতোমধ্যে স্বামীর ডিএনএ নমুনা জমা দিয়েছেন, ডজনখানেক ফরম পূরণ করেছেন, চিঠি লিখেছেন এবং তথ্য খুঁজতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত হয়েছেন।
৩৭ বছর বয়সী কোচেমাসভ তার দ্বিতীয় মিশনে পোকরোভস্কের কাছ থেকে নিখোঁজ হন। ওই এলাকা এখন রাশিয়ার দখলে।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দুই পক্ষ মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষ হতাহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৭০ হাজার ইউক্রেনীয় সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি।
গত চার মাসে সাত হাজারের বেশি মরদেহ ইউক্রেনে ফেরত পাঠিয়েছে রাশিয়া। তাদের অধিকাংশেরই পরিচয় জানা যায়নি। এখন চলছে সেসব শনাক্তের চেষ্টা।
সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে সাজানো সারি সারি মরদেহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
জটিল শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া
রয়টার্স আটজন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা, মন্ত্রী, ইউক্রেনীয় ও আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিজ্ঞানী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা। কিয়েভের একটি ডিএনএ ল্যাবও পরিদর্শন করা হয়েছে।
অনেক দেহ পচে যাওয়া বা খণ্ডিত অবস্থায় আসায় ল্যাবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি ও মিল খুঁজতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়।
২০২২ সালের পর থেকে ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডিএনএ ল্যাবের সংখ্যা ৯টি থেকে বৃদ্ধি করে ২০টি করেছে এবং ফরেনসিক জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করে ৪৫০ করেছে। কিন্তু ফেরত আসা মরদেহের সংখ্যা ছিল অপ্রত্যাশিত।
ফরেনসিক কেন্দ্রের উপপরিচালক রুসলান আব্বাসভ বলেন, আগে আমরা এক, দুই বা সর্বোচ্চ ১০টা মরদেহ পেতাম। এরপর তা হতে থাকলো একশ, পাঁচশ, নয়শ এবং ক্রমেই সংখ্যা বাড়তে থাকলো।
মরদেহের সংখ্যার পাশাপাশি আরেকটি জটিলতা হলো, পরীক্ষার প্রক্রিয়া। অনেক জটিল ক্ষেত্রে জিনেটিক সাদৃশ্য যাচাইয়ে ৩০ বার পর্যন্ত চেষ্টা করতে হয়।
ইউক্রেন কেবল সম্প্রতি সক্রিয় সৈন্যদের ডিএনএ সংগ্রহ শুরু করেছে। এর আগে আত্মীয়দের ডিএনএ ব্যবহার করেই সাদৃশ্য খুঁজতে হতো।
মৃতদেহের সংখ্যা নির্দেশ করছে ক্ষতির মাত্রা
হঠাৎ করে এত মরদেহ ফেরত আসা শুধু কারিগরি চ্যালেঞ্জই নয়, বরং ইউক্রেনের ক্ষতির ব্যাপকতাও সামনে এনেছে।
কিয়েভ ও মস্কো উভয়ই হতাহত সেনার সংখ্যা নিয়ে সাধারণত কোনও তথ্য প্রকাশ করে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জুন মাসের হিসাব বলছে, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সাড়ে নয় লাখের এর বেশি রুশ এবং চার লাখ ইউক্রেনীয় হতাহত হয়েছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত মাস পর্যন্ত ইউক্রেন ১১ হাজার ৭৪৪ জনের মৃতদেহ পেয়েছে। এর মধ্যে জুনেই এসেছে ছয় হাজার ৬০ এবং আগস্টে আরও এক হাজার মরদেহ।
ইউক্রেনের দিক থেকে কতজন সেনার মরদেহ রাশিয়াকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, সে সংখ্যা জানা যায়নি। তবে রাশিয়ার দাবি, তারা জুনে মাত্র ৭৮ জনের মরদেহ পেয়েছে।
ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইগর ক্লাইমেনকো অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার অবহেলায় শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির দেহাবশেষ তিনটি ভিন্ন ব্যাগে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান ভরসা ডিএনএ
২০২২ সালের জুন থেকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ৫০ বারের বেশি মরদেহ বিনিময় প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। ইউক্রেনকে তারা হিমায়ক ট্রাক, বডিব্যাগ ও সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করে আসছে।
কিয়েভের একটি মর্গে জুনের শেষ দিকে প্রায় ৫০ জনের মরদেহ বহনকারী একটি ট্রাক খোলা হলে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তকারীরা তখন ব্যাগগুলো খুলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন এবং ইউনিক নম্বর দিয়ে নথিভুক্ত করেন।
পুলিশ তদন্ত কর্মকর্তা ওলহা সিডোরেঙ্কো বলেন, প্রথমে দেহগুলো থেকে অস্ত্র বা বিস্ফোরক, ইউনিফর্ম, পরিচয়পত্র বা অন্যান্য জিনিসপত্র পরীক্ষা করা হয়। তিনি জানান, এগুলোই পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র তৈরি করে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw68ca9260c92d4" ) );
স্ভিয়েতকোভা ইতোমধ্যে স্বামীর নিখোঁজের তথ্য পুলিশে জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি সব দিয়েছি—তার ট্যাটু, দাগ, তিল, চেহারা—যা কিছু তাকে চিনতে সাহায্য করতে পারে। আমি ওর একটা চিরুনিও এনেছিলাম।
বিদ্যুৎবিভ্রাটে ভরসা জেনারেটর
ক্লাইমেনকো জানান, সব মরদেহ শনাক্ত করতে ১৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ল্যাবগুলোতে প্রায় সারাদিন কাজ চলছে। বিদ্যুৎবিভ্রাট মোকাবেলায় জেনারেটর ও ব্যাটারি রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের আন্দ্রেস রদ্রিগেজ জোরো বলেন, কখনও একাধিক আত্মীয়ের ডিএনএ নিতে হয়। বিশেষজ্ঞরা জানান, পোড়া দেহের ডিএনএ শনাক্ত করা সবচেয়ে কঠিন।
তবুও স্ভিয়েতকোভার আশা অন্যরকম। তার স্বামীর ডিএনএ কোনও মরদেহের সঙ্গে মিলে যাক, সেটা তিনি চান না। তিনি বলেন, আমি চাই, ইয়ারোস্লাভ জীবিত ফিরে আসুক। আমি এখনও প্রতি মাসে তার ফোন নম্বরে রিচার্জ করি, যেন তার নম্বর সক্রিয় থাকে। প্রতিদিন তাকে আমার সারাদিনের ঘটনা লিখি, যেন সে জানতে পারে—আমি তার অনুপস্থিতিতে কেমন ছিলাম।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স